দেশজুড়ে

পুলিশ কনস্টেবল সম্রাটের মৃত্যু ঘিরে রহস্য

বায়ান্ন প্রতিবেদন

খুলনার সোনাডাঙ্গা রেলওয়ে জেলা পুলিশ লাইনসে দায়িত্বরত পুলিশ কনস্টেবল সম্রাট বিশ্বাসের মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শনিবার (১৯ এপ্রিল) সকালে প্রতিদিনের মতোই তিনি অস্ত্রাগারের দায়িত্ব পালন করতে কর্মস্থলে যান। তবে দায়িত্ব পালনরত অবস্থাতেই ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা।

নিজ নামে ইস্যুকৃত রাইফেল ব্যবহার করে মাথায় গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় নিজ জেলা গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার চরপদ্মবিলা গ্রামে, যেখানে শেষবারের মতো ফিরতে হলো তাকে নিথর দেহ হয়ে।

সম্রাট বিশ্বাসের হঠাৎ মৃত্যুতে স্তব্ধ পরিবার, শোকাহত স্বজনরা। কেন তিনি এমন পথ বেছে নিলেন, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলছে সবাই। তবে পরিবারের দাবি, দাম্পত্য কলহের জেরে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। সবার মনে একটাই প্রশ্ন, কেন এমন করলেন সম্রাট? পারিবারিক অশান্তি, নাকি অন্য কোনো অজানা কারণ- রয়ে গেছে ধোঁয়াশা।

শনিবার (১৯ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে খুলনা থেকে আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে সম্রাটের মরদেহ তার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। এ সময় পরিবার ও স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে আশপাশের এলাকা।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সম্রাট সবার ছোট। বড় বোন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা ও ছোট বোন মাস্টার্সে অধ্যায়নরত। ২০১৮ সালে পুলিশে কনস্টেবল পদে নিয়োগ পান সম্রাট। চাকরিরত অবস্থায় প্রেমে জড়িয়ে পড়েন সাতক্ষীরা জেলা পুলিশে কর্মরত নারী কনস্টেবল পুঁজা দাসের সঙ্গে। ছয় মাস আগে পরিবারের সম্মতিতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তারা। সামনের মাসে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার কথা ছিল তাদের। সম্প্রতি খুলনা রেলওয়ে পুলিশে কর্মরত ছিলেন। তার স্ত্রী পূজা বিশ্বাসও পুলিশ সদস্য, বর্তমানে কর্মরত সাতক্ষীরা জেলায়। কয়েকদিন ধরে দাম্পত্য কলহ চলছিল সম্রাট ও তার স্ত্রীর মধ্যে। গতরাতে স্ত্রীর সঙ্গে রাগারাগি হয় সম্রাটের। মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত ছিলেন তিনি। এ কারণেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি পরিবারের। গত আশ্বিন মাসে কোর্ট ম্যারেজের পর আগামী ১৯ বৈশাখে পারিবারিকভাবে স্ত্রীকে ঘরে তোলার কথা ছিল। কিন্তু সেই আয়োজন আর বাস্তবায়ন হলো না।

এদিকে, সম্রাটের স্ত্রী ও শ্বশুর-শাশুড়ি খুলনায় এলেও গ্রামের বাড়িতে আসেননি। এতে পরিবারে এক ধরণের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করছেন সম্রাটের পরিবার। তবে প্রকৃত কারণ এখনও অজানা।

এ ঘটনায় শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন সম্রাটের বাবা-মা। ছেলের মৃত্যুর কথা তারা যেন এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না। বারবার ছেলের নাম ধরে ডেকে উঠছেন, কিন্তু কোনো সাড়া মিলছে না। প্রতিবেশী আলমগীর ফকির জানান, সম্রাট এলাকার একজন ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তার সঙ্গে কারও কোনো বিরোধ ছিল না। যদি নিজের কষ্ট কারও সঙ্গে ভাগ করতেন, হয়তো এমনটা হতো না।

সম্রাটের মামা সত্যজিৎ রায় জানান, আমরা খবর পেয়ে খুলনা গিয়ে আমার ভাগ্নের মরদেহ হাসপাতালে পড়ে থাকতে দেখি। ৬ মাস আগে আমাদের সে জানায় সাতক্ষীরা পুলিশে চাকরি করে এক মেয়েকে সে ভালোবাসে এবং বিয়ে করতে চায়। পরিবারের একমাত্র ছেলে বলে আমরা আর কিছু না ভেবে দুই পরিবার থেকে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে দেই। বিয়ের পর থেকে পরিবারে সে এক টাকাও দিত না। সব বউ নিয়ে যেত।

তিনি আরও জানান, ওর সহকর্মীদের কাছ থেকে জানতে পারি প্রতিদিনই ওদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ লেগে থাকতো। গতরাতে ফোনে দুজনের মধ্যে রাগারাগি হয়। এরপরই এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

সম্রাটের ভগ্নিপতি বিপ্লব কুমার সেন জানান, তার শালাবাবুর সঙ্গে বাবা-মায়ের কোনো বিরোধ ছিল না। পরিবারের একমাত্র ছেলে হওয়ায় তার ইচ্ছাকেই সবসময় প্রাধান্য দেওয়া হতো। যে মেয়েকে তিনি বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, পরিবারও সেটি মেনে নেয়। তবে বেশ কিছুদিন ধরে স্ত্রীর সঙ্গে তার নিয়মিত ঝগড়া-বিবাদ চলছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই পারিবারিক অশান্তিই আত্মহত্যার পেছনে প্রধান কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন তারা। এর বাইরে অন্য কোনো কারণ তাদের জানা নেই।

উল্লেখ্য, গতকাল শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভোরে খুলনার সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকার (দ্বিতীয় পর্যায়) খুলনা রেলওয়ে জেলা কার্যালয়ে অস্ত্রাগারে দায়িত্বরত অবস্থায় সম্রাট নিজের ইস্যুকৃত রাইফেল দিয়ে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #খুলনা #পুলিশ কনস্টেবল #সম্রাট বিশ্বাস #মৃত্যু