বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির মতে, চলমান বৈশ্বিক সহিংসতা ও অস্থিরতার পেছনে বারবার উঠে আসছে তিন প্রভাবশালী নেতার নাম—ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সংস্থাটি তাদের ‘হিংস্র শিকারি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে এ মন্তব্য করেন সংস্থাটির প্রধান অ্যাগনেস ক্যালামার্ড।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ধরে রাখতে গিয়ে এই তিন নেতা বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন এবং তা ক্ষুণ্ন করছেন।
অ্যামনেস্টির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এর ফলে বর্তমান বিশ্বে এক ধরনের প্রাচীন বর্বরতা দীর্ঘস্থায়ী রূপে ফিরে আসছে এবং ক্রমে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) লন্ডনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অ্যাগনেস ক্যালামার্ড আক্ষেপ করে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকস্টের ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়ে গত ৮০ বছরে যে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন তিল তিল করে গড়ে তোলা হয়েছিল, ২০২৫ সালে এসে তা পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
ক্যালামার্ড অভিযোগ করে বলেন, বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো এই ‘শিকারিদের’ থামানোর বদলে তোষণ করছে। তবে এই অন্ধকার সময়ে স্পেনের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন তিনি। ফিলিস্তিন ও ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সমালোচনা করে স্পেন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নৈতিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ক্যালামার্ড যুক্তি দেন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন বিশ্বের ওপর ‘অতিরঞ্জিত’ প্রভাব ফেলেছেন। তাদের আচরণ অন্যদেরও একই রকম কাজ করতে উৎসাহিত করছে। এর ফলে বিশ্ব এখন তিন-চার বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ও হিংস্র পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।
অ্যামনেস্টির ৪০০ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে আফগানিস্তান থেকে জিম্বাবুয়ে পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে মৌলিক নাগরিক স্বাধীনতার ওপর হামলার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
গাজায় ইসরাইলের চালানো গণহত্যা, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং ইরানের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের নিকৃষ্টতম উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়েছে প্রতিবেদনে।
ফিলিস্তিনপন্থি আন্দোলন দমনের জন্য যুক্তরাজ্যকে অভিযুক্ত করেছে অ্যামনেস্টি। এছাড়া ২০২৫ সালে আফগানিস্তানে তালেবানদের লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং নেপালে দলিত নারীদের ওপর সহিংসতার তদন্তে ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদেনে।
প্রতিবেদনে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলি হামলায় গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ অভিযানে ৩ হাজার এবং লেবাননে ২ হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণহাণি ঘটেছে।
অন্যদিকে, চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ হাজারের বেশি মানুষ।
তবে এই অস্থিরতার মধ্যেও কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির মতে, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা প্রতিবাদী আন্দোলনগুলো বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে নতুন গতি যোগ করেছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালত-এ ইসরাইলের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত-এর মাধ্যমে ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে ও তালেবান নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঘটনাকেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অ্যামনেস্টির মূল্যায়নে, এসব পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সুরক্ষার সংগ্রামে নতুন আশার সঞ্চার করেছে এবং ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
এসি//