আন্তর্জাতিক

লিমন-বৃষ্টির হত্যাকারী নিজেকে ‘ঈশ্বর’ বলে দাবি করতেন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টির হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে নতুন নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া সন্দেহভাজন হিশাম আবুঘারবিয়েহকে ঘিরে এবার তার পরিবারের পক্ষ থেকেই গুরুতর অভিযোগ ও সতর্কবার্তার কথা জানা গেছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে হিশামের ছোট ভাই আহমদ আবুঘারবিয়েহ দাবি করেন, তার ভাইয়ের মানসিক অবস্থা নিয়ে তারা বহুবার পুলিশকে সতর্ক করেছিলেন।

তিনি জানান, হিশাম হঠাৎ হঠাৎ প্রচণ্ড রেগে যেতেন এবং সেই রাগে আক্রমণাত্মক আচরণ করতেন। মাঝরাতে চিৎকার করে নিজেকে ‘ঈশ্বর’ বলেও দাবি করতেন বলে জানান তিনি।

আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, হিশামের এমন অস্বাভাবিক আচরণের কারণে তার সঙ্গে একসঙ্গে থাকা নিরাপদ ছিল না।

তিনি আরও বলেন, হিশামের হয় একা থাকা উচিত ছিল, না হলে তাকে গৃহহীন অবস্থায় থাকতে হতো।

গত ২৪ এপ্রিল ফ্লোরিডার টাম্পা বে এলাকায় দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে প্রায় ১০ দিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি। পরে হাওয়ার্ড ফ্র্যাংকল্যান্ড সেতুর কাছে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যেখানে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। দুই দিন পর একই এলাকার একটি জলাধার থেকে আরেকটি খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার হলেও সেটি বৃষ্টির কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

মামলার তদন্তে জানা যায়, নিখোঁজ হওয়ার রাত অর্থাৎ ১৭ এপ্রিল রাত ১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত হিশাম অন্তত ছয়বার ফ্র্যাংকল্যান্ড সেতু এলাকায় যাতায়াত করেছেন। তদন্তকারীদের ধারণা, তিনি মরদেহ ও আলামত পানিতে ফেলে প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা করে থাকতে পারেন।

ঘটনার দিন হিশাম নিজের পরিবারের বাড়িতেও গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তার উপস্থিতিতে অস্বস্তি তৈরি হলে পরিবারই পুলিশে খবর দেয়।

আহমদ আবুঘারবিয়েহ জানান, তিনি নিজেই ফোন করে পুলিশ ডাকেন, কারণ হিশামের আচরণ অত্যন্ত সন্দেহজনক ছিল।

আদালতের নথিতে উঠে এসেছে, ২০২৩ সাল থেকে হিশামের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ প্রায় বন্ধ ছিল। এর আগেও তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে ছিলেন বলে জানা যায়।

নিহতদের পরিবারের উদ্দেশে একটি বার্তা দিয়েছেন হিশামের ভাই আহমদ।

এতে তিনি বলেছেন, আমি তাদের কথা ভাবা বন্ধ করতে পারছি না। আমার খুবই খারাপ লাগছে। যা ঘটেছে তার জন্য আমি সত্যিই ক্ষমাপ্রার্থী। আমি এবং আমার পুরো পরিবার প্রচন্ড লজ্জা ও অপরাধবোধে ভুগছি। আমরা অতীতেও পুলিশকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলাম।

আদালতের নথি অনুযায়ী, পরিবারের পক্ষ থেকে হিশাম আবুঘারবিয়েহের বিরুদ্ধে দুইবার সুরক্ষামূলক আদেশের (প্রোটেক্টিভ অর্ডার) আবেদন করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২০২৩ সালের আবেদনটি মঞ্জুর হলেও ২০২৫ সালের আবেদনটি খারিজ হয়ে যায়। 

২০২৫ সালের আবেদনটি খারিজ করার সময় বিচারক উল্লেখ করেন যে, শারীরিক লাঞ্ছনার (ব্যাটারি) ফৌজদারি অভিযোগগুলো যথাযথভাবে এগিয়ে নেয়া হয়নি, তাই এই অনুরোধ রাখা সম্ভব হচ্ছে না। 

আহমদ জানান, আর্থিক সংকটের কারণে ২০২৩ সালে তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে শারীরিক লাঞ্ছনার অভিযোগ নিয়ে তিনি আর সামনে এগোননি।

তিনি বলেন, আমি অভিযোগ তুলে নিয়েছিলাম, কারণ আমার মনে হয়েছিল এতে অনেক টাকা খরচ হবে। কিন্তু, ওই সিদ্ধান্তের পরপরই আমি অনুতপ্ত হয়েছিলাম।

২০২৩ সালের সেই সুরক্ষামূলক আদেশের আবেদনের একটি কপি সিবিএস নিউজের হাতে এসেছে।

সেখানে আহমদ লিখেছিলেন, তার ভাই তাকে কয়েকবার ঘুষি মেরেছিলেন ও শার্ট ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। তিনি লেখেন, এতে আমার রক্তপাত হয় এবং মুখে কালশিটে পড়ে যায়। আমি পুলিশকে ফোন করতে বাইরে গেলে সে পরিবারের মিনিভ্যানটি নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু কাজ হবে না বুঝতে পেরে সে আবার ফিরে আসে।

অন্য এক ঘটনার কথা উল্লেখ করে ছোট ভাই অভিযোগ করেন, হিশাম তার মায়ের সঙ্গে সামান্য তর্কের পর পুরো বসার ঘর (লিভিং রুম) তছনছ করে ফেলেছিলেন। প্রায়ই তার ভাই মাঝরাতে চিৎকার করে নিজেকে ঈশ্বর দাবি করতেন এবং বলতেন যে তার সামনে মাথা নত করা উচিত সবার।

হিশাম আবুঘারবিয়েহ পক্ষে লড়ছে হিলসবরো কাউন্টি পাবলিক ডিফেন্ডারের অফিস।

সংস্থাটির এক মুখপাত্র সিবিএস নিউজকে বলেন, আমরা বুঝতে পারছি এই মামলাটি নিয়ে জনমনে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে। তবে, পেশাগত নৈতিকতা এবং আমাদের মক্কেলের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার স্বার্থে আমরা জনসমক্ষে কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকছি। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের মক্কেলের প্রতিনিধিত্ব করার বিষয়েই আমরা বর্তমানে মনোনিবেশ করছি।  

আহমদ আবুঘারবিয়েহের দেওয়া বক্তব্যের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করেনি হিলসবরো কাউন্টি স্টেট অ্যাটর্নির কার্যালয়। তবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে তারা জানিয়েছে, হিশাম আবুঘারবিয়েহ সমাজের জন্য এখনও এক বড় হুমকি এবং বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে রাখা উচিত। 

স্টেট অ্যাটর্নি সুজি লোপেজ বলেন, এই অত্যন্ত কঠিন সময়ে বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থীর পরিবারের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা রইল। তারা সত্য জানার জন্য যে অপেক্ষা করছেন এবং আমরা সবসময় তাদের পাশে আছি। 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #যুক্তরাষ্ট্র #ফ্লোরিডা #শিক্ষার্থী নিহত #হিশাম আবুঘারবিয়েহ #ঈশ্বর