২০২২ সালের সেই রাতটা এখনো ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি। লুসাইল স্টেডিয়ামের আলো, কোটি মানুষের নিঃশ্বাস আটকে থাকা টাইব্রেকার, আর শেষ শটের পর আকাশের দিকে দু’হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষ—লিওনেল মেসি। মনে হয়েছিল, এ যেন এক যুগের সমাপ্তি। বিশ্বকাপ জিতে সব অর্জন পূর্ণ করে হয়তো বিদায় নেবেন ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত এই জাদুকর।
কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ হচ্ছে না।
ফুটবল বিশ্বকে আরও একবার নিজের মায়াজালে বাঁধতে ফিরছেন মেসি। ২০২৬ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার নেতৃত্বে দেখা যাবে বিশ্বকাপজয়ী এই অধিনায়ককে। বৃহস্পতিবার ঘোষিত ২৬ সদস্যের দলে জায়গা পেয়েছেন ৩৮ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। আর এতেই নিশ্চিত হয়েছে—ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে আরও একবার নামবে “শেষ নাচের” মহাযুদ্ধ।
২০২৬ বিশ্বকাপ মেসির ক্যারিয়ারে শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি হতে যাচ্ছে ইতিহাস ছোঁয়ার মঞ্চ। মাঠে নামতে পারলে এটি হবে তাঁর ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। এর মাধ্যমে পুরুষ ফুটবলে সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ খেলা ফুটবলারদের তালিকায় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পাশে নাম লেখাবেন তিনি। ইতোমধ্যে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ২৬ ম্যাচ খেলার রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
কাতার বিশ্বকাপের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, আন্তর্জাতিক ফুটবলে হয়তো ধীরে ধীরে নিজেকে সরিয়ে নেবেন মেসি। কিন্তু সময় যেন তাঁকে এখনো থামাতে পারেনি। বয়স ৩৮ হলেও মাঠে তাঁর উপস্থিতি এখনো প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্ক, আর সমর্থকদের জন্য নিখাদ আবেগ।
অবশ্য কয়েকদিন আগে ইন্টার মায়ামির হয়ে এমএলএস ম্যাচে বদলি হয়ে মাঠ ছাড়ার পর মেসির চোট নিয়ে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। পরে ক্লাব জানায়, এটি বড় কোনো সমস্যা নয়। বাঁ পায়ের হ্যামস্ট্রিংয়ে সামান্য ক্লান্তি অনুভব করেছিলেন তিনি। ফলে বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতে আপাতত বড় কোনো শঙ্কা দেখছে না আর্জেন্টিনা শিবির।
লিওনেল স্কালোনির দলে অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের মিশেল এবারও চোখে পড়েছে স্পষ্টভাবে। গোলবারে আছেন কাতার বিশ্বকাপের নায়ক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। রক্ষণভাগে থাকছেন ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও নিকোলাস ওতামেন্দির মতো নির্ভরতার প্রতীকরা। মাঝমাঠে গতি আর সৃজনশীলতার দায়িত্বে থাকবেন আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজ। আর সামনে মেসির সঙ্গে আক্রমণে থাকবেন লাওতারো মার্তিনেজ ও হুলিয়ান আলভারেজ।
তবে এবারের স্কোয়াডে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল তরুণ নিকো পাজকে ঘিরে। নতুন প্রজন্মের এই ফুটবলারকে ভবিষ্যতের বড় তারকা হিসেবে দেখছেন অনেকে। অর্থাৎ, আর্জেন্টিনা শুধু বর্তমানের শক্তি নিয়েই নয়, ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়েও নামছে বিশ্বমঞ্চে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় বসতে যাওয়া এবারের বিশ্বকাপে ‘জে’ গ্রুপে খেলবে আর্জেন্টিনা। ১৭ জুন কানসাস সিটিতে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে তাদের অভিযান। এরপর ডালাসে অস্ট্রিয়া ও জর্ডানের মুখোমুখি হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
বিশ্বকাপের আগে হন্ডুরাস ও আইসল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলবে আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচ দুটিতে মাঠে নামতে পারলে জাতীয় দলের জার্সিতে ২০০ ম্যাচ খেলার অনন্য মাইলফলকও ছুঁয়ে ফেলবেন মেসি।
ফুটবল ইতিহাসে কিছু কিছু অধ্যায় থাকে, যেগুলো পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা ঠিক তেমনই এক গল্প—যেখানে ট্রফির চেয়েও বড় হয়ে ওঠে আবেগ, স্বপ্ন আর কোটি মানুষের ভালোবাসা। ২০২৬ বিশ্বকাপ হয়তো তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বমঞ্চ। আর তাই পৃথিবীর অসংখ্য ফুটবলভক্ত এখন অপেক্ষায়—আরও একবার কি আকাশি-সাদা জার্সিতে জাদু দেখাবেন ফুটবলের এই অমর শিল্পী?
পিডি