ফুটবলের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত কোনটি? কারও কাছে গোল, কারও কাছে ট্রফি উঁচিয়ে ধরা, আবার কারও কাছে শেষ বাঁশির উল্লাস। কিন্তু ম্যাচ শুরুর ঠিক আগে এমন একটি দৃশ্য আছে, যা প্রতিবারই কোটি দর্শকের চোখে অন্যরকম প্রশান্তি এনে দেয়।
রেফারি ম্যাচ শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। টানেলের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছেন দুই দলের খেলোয়াড়রা। কিন্তু তারা একা নন। বিশ্বের সবচেয়ে দামি, সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলারদের হাত শক্ত করে ধরে হাঁটছে একদল ছোট্ট শিশু। কারও চোখে বিস্ময়, কারও মুখে লাজুক হাসি, কেউ আবার গ্যালারির দিকে তাকিয়ে অভিভূত।
ফুটবলের ভাষায় এদের বলা হয় ‘প্লেয়ার এসকর্ট’। অনেকেই আবার ‘ম্যাচ মাসকট’ নামেও চেনেন। কিন্তু কেন ম্যাচের আগে শিশুদের মাঠে আনা হয়? কবে শুরু হয়েছিল এই প্রথা? আর এর পেছনের বার্তাই বা কী?
যেভাবে শুরু হয়েছিল এই ঐতিহ্য
আশির দশকে ইউরোপের কিছু ম্যাচে খেলোয়াড়দের সঙ্গে শিশুদের মাঠে নামতে দেখা গেলেও, সেটি ছিল বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ। এই প্রথা আন্তর্জাতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে।
২০০১ সালে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক তহবিল ইউনিসেফ যৌথভাবে "সে ইয়েস ফর চিলড্রেন" (Say Yes for Children) নামে একটি বৈশ্বিক প্রচারণা শুরু করে।
এর উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাকে ব্যবহার করে শিশুদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং শিক্ষার বার্তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া। সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালের জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপ থেকে আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলোয়াড়দের সঙ্গে শিশুদের মাঠে প্রবেশের প্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। এরপর থেকে এটি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরিচিত ও সুন্দর ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, আছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক বার্তা
খেলোয়াড়দের পাশে শিশুদের উপস্থিতি নিছক সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ।
মাঠে শান্ত পরিবেশ তৈরির বার্তা
ফুটবলের ইতিহাসে দর্শকদের সহিংস আচরণ, গ্যালারি থেকে বোতল কিংবা বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারার মতো অপ্রীতিকর ঘটনার অভাব নেই।
কিন্তু যখন একজন ফুটবলার একটি নিষ্পাপ শিশুর হাত ধরে মাঠে প্রবেশ করেন, তখন পুরো পরিবেশই বদলে যায়। দর্শকদের মধ্যেও ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। সহিংসতা নয়, মানবিকতার ছবিটাই তখন বড় হয়ে ওঠে।
‘ফেয়ার প্লে’র নীরব শিক্ষা
ফুটবল মানেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ধাক্কাধাক্কি, তর্ক-বিতর্ক কিংবা উত্তপ্ত মুহূর্তও এই খেলার অংশ।
তবে ম্যাচের আগে শিশুদের উপস্থিতি খেলোয়াড়দের মনে করিয়ে দেয়—লড়াই হোক মাঠের ভেতরে, কিন্তু সম্মান ও মানবিকতা যেন কখনও হারিয়ে না যায়। এ কারণেই এই দৃশ্যকে অনেকেই ‘ফেয়ার প্লে’র প্রতীক হিসেবেও দেখেন।
একটি শিশুর আজীবনের স্বপ্ন
এই প্রথার আরেকটি বড় উদ্দেশ্য শিশুদের জন্য অবিস্মরণীয় একটি অভিজ্ঞতা তৈরি করা।

অনেক সময় দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত বা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিশেষভাবে এই সুযোগ দেওয়া হয়। নিজের প্রিয় ফুটবল তারকার হাত ধরে বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে হাঁটার স্মৃতি তাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অর্জন হয়ে থাকে।
‘প্লেয়ার এসকর্ট’ আর ‘ম্যাচ মাসকট’ কি এক?
অনেকেই এই দুই শব্দ একই অর্থে ব্যবহার করেন। কিন্তু ফুটবলের আনুষ্ঠানিক পরিভাষায় এদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
প্রতি ম্যাচে দুই দলের ২২ জন খেলোয়াড়ের সঙ্গে যে ২২ জন শিশু মাঠে প্রবেশ করে এবং জাতীয় সঙ্গীতের সময় খেলোয়াড়দের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, তারা হলো প্লেয়ার এসকর্ট।
অন্যদিকে ম্যাচ মাসকট সাধারণত একজন বা দুজন বিশেষ শিশু। তারা টসের সময় রেফারির পাশে থাকে, অফিসিয়াল দলীয় ছবিতে অংশ নেয় এবং ম্যাচ শুরুর আগে কিছু সময় ফুটবলারদের সঙ্গে মাঠে কাটানোর সুযোগ পায়।

কীভাবে নির্বাচন করা হয় এই শিশুদের?
সাধারণত ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুরাই এই সুযোগ পেয়ে থাকে। তবে নির্বাচন পদ্ধতি প্রতিযোগিতা ও আয়োজকভেদে ভিন্ন হয়।
বিশ্বকাপের মতো আসরে প্রধান স্পনসর প্রতিষ্ঠান—যেমন ম্যাকডোনাল্ডস—বিশ্বব্যাপী লটারি কিংবা বিভিন্ন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সাধারণ পরিবারের শিশুদের নির্বাচন করে। এরপর তাদের বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়ার পুরো ব্যয়ও বহন করে।
অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনার মতো ক্লাবগুলো নিজেদের ফুটবল একাডেমি কিংবা নিবন্ধিত সমর্থকদের শিশু সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচন করে।
আবার অনেক ক্লাব সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের এই সুযোগ দেয়। যদিও কিছু ক্লাব নির্দিষ্ট ফির বিনিময়ে এই অভিজ্ঞতা পাওয়ার ব্যবস্থাও রেখে থাকে।
ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে মানবিকতার বার্তা
খেলোয়াড়দের সঙ্গে শিশুদের মাঠে প্রবেশের এই দৃশ্য আসলে কোনো আনুষ্ঠানিকতার অংশ নয়; এটি একটি বৈশ্বিক বার্তা।
এখানে প্রচার করা হয় না কোনো পণ্য বা প্রতিষ্ঠান। বরং বিশ্বের কোটি মানুষের সামনে তুলে ধরা হয় একটি বিশ্বাস—শিশুরাই ভবিষ্যৎ, আর তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই সবার প্রথম দায়িত্ব।

তাই ম্যাচ শুরুর আগে যখন সবুজ গালিচার ওপর একজন বিশ্বসেরা ফুটবলার আর একটি সাধারণ শিশুর হাত এক হয়ে যায়, তখন সেটি শুধু ফুটবলের একটি প্রথা থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে মানবিকতা, সম্প্রীতি, সমতা এবং সুন্দর ভবিষ্যতের এক নীরব অথচ শক্তিশালী প্রতীক।
হয়তো এ কারণেই ম্যাচের ৯০ মিনিটের লড়াই শুরুর আগে কয়েক সেকেন্ডের এই দৃশ্যটি কোটি মানুষের হৃদয়ে আলাদা করে জায়গা করে নেয়। কারণ, ফুটবল কেবল গোলের খেলা নয়—ফুটবল মানুষকে একসঙ্গে পথ চলারও শিক্ষা দেয়।
এসি//