টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের কারণে দেশের সাতটি জেলার জনজীবন এখনো বিপর্যস্ত। বন্যায় লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৫১ জনে পৌঁছেছে।
রোববার( ১২ জুলাই) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দিন দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সাত জেলার ৫৯টি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। এতে পানিবন্দী হয়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন।
মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে, যেখানে মারা গেছেন ২৮ জন। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দেশে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ৫ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টিতে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। এ সময়ে চট্টগ্রামে এক হাজার ৩৫৪ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায়ও ১৫১ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এদিকে চট্টগ্রামের পর সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জেও বন্যা শুরু হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগামী দুই থেকে তিন দিন আরও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকায় আগামী এক দিনের মধ্যে পানি কমতে পারে। তবে সিলেট বিভাগের নিম্নাঞ্চলে পরিস্থিতির উন্নতি বা অবনতি নির্ভর করবে নতুন করে কতটা বৃষ্টি হয় তার ওপর।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর অনেক এলাকায় এখনো ঘরবাড়িতে পানি রয়েছে। কোথাও কোথাও পানি কমতে শুরু করলেও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখনো ফেরেনি। কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নষ্ট হয়েছে খাদ্যশস্য এবং ডুবে রয়েছে অধিকাংশ নলকূপ, ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
অন্যদিকে কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, রামু ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনো বন্যার পানি রয়েছে। কিছু স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে নতুন করে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। অনেক এলাকায় নৌকাই এখন একমাত্র চলাচলের মাধ্যম।
তিন পার্বত্য জেলাতেও পানি নামতে শুরু করায় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে গ্রামীণ সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তলিয়ে গেছে আমন-আউশের বীজতলা, জুমচাষ ও সবজিক্ষেত। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে অনেকে বাড়ি ফিরলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আরও সময় লাগবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হবিগঞ্জে বন্যায় প্রায় সাড়ে ছয় হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। মৌলভীবাজারের সাত উপজেলার মধ্যে পাঁচটিতে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ৭ হাজারের বেশি পরিবার।
সুনামগঞ্জে টানা পাঁচ দিনের বৃষ্টি ও উজানের ঢলে নদ-নদী এবং হাওরের পানি দ্রুত বাড়ছে। গত মঙ্গলবার জেলায় মৌসুমের সর্বোচ্চ ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর প্রভাবে রমা নদীর পানিও বৃদ্ধি পেয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় সেখানে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নেত্রকোনাতেও কয়েক দিনের মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলে জেলার সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে। এতে বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
অন্যদিকে, কুড়িগ্রামে টানা বৃষ্টিতে নদ-নদীর পানি বেড়ে ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও দুধকুমার নদে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে বসতভিটা হারানোর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে, যশোরের কেশবপুর পৌর এলাকায় ভারী বৃষ্টিতে দুই শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পি/ডি