দেশজুড়ে

বন্যায় কক্সবাজারে ৩২ প্রাণহানি, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি মৎস্য খাতে

জসিম সিদ্দিকী, কক্সবাজার প্রতিনিধি

ছবি: বায়ান্ন টিভি

টানা নয় দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও কক্সবাজারের মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। 

জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৩২ জন এবং জেলার ৭০টি ইউনিয়নের প্রায় ৪৯ শতাংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

বর্তমানে জেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মানুষ অবস্থান করছেন। সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে মৎস্য খাত। বন্যার পানিতে ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর ও  ঘেরের মাছ, চিংড়ি, পোনা ও পোস্ট লার্ভা (পিএল) ভেসে যাওয়ায় প্রায় ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

সোমবার (১৩ জুলাই) রাতে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত বন্যা পরিস্থিতি বিষয়ক মতবিনিময় সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সরকার ইতোমধ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কোথাও স্লুইসগেটের কারণে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, বন্যায় ১ হাজার ৬১৩টি বসতবাড়ি, ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ২ হাজার ৪৪ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ধসে গেছে ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট। 

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত কক্সবাজারে ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। পানি নামতে শুরু করলেও অনেক এলাকায় এখনো যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত, কাদামাটি ও দূষিত পানির কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরেনি।

মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যায় ৭৬৮ জন মৎস্যচাষি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পানিতে ভেসে গেছে ১ হাজার ৯৭ মেট্রিক টন মাছ, ৩৮৫ মেট্রিক টন চিংড়ি, ৩ লাখ ৫৬ হাজার পোনা এবং ২২১ লাখ পোস্ট লার্ভা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে উখিয়া উপজেলায়, যেখানে প্রায় ১৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকার মৎস্যসম্পদ নষ্ট হয়েছে।

চকরিয়ার মৎস্যচাষি মনির উদ্দিন জানান, অধিকাংশ পুকুরের বাঁধ ভেঙে মাছ বেরিয়ে গেছে। একই সঙ্গে কাদায় ভরে যাওয়ায় অনেক পুকুরে নতুন করে মাছ চাষ শুরু করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।

কক্সবাজারের মৎস্য ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রফিক জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের দ্রুত পুনর্বাসনের পাশাপাশি ভর্তুকি মূল্যে পোনা ও মাছের খাদ্য সরবরাহ, স্বল্পসুদে ঋণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর ও ঘের সংস্কারে সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় চলতি বছরের এই ক্ষতির প্রভাব আগামী মৌসুমের মাছ উৎপাদনেও পড়তে পারে।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু ত্রাণ বিতরণ নয়, দীর্ঘমেয়াদে বন্যা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ, নদী-খালের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো দ্রুত সংস্কার না করলে কক্সবাজারের অর্থনীতি ও মৎস্য উৎপাদনে এই দুর্যোগের নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে।

 

পি/ডি

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #বন্যা #কক্সবাজার