সব স্বপ্ন যে ট্রফি ছুঁয়েই পূর্ণ হয়, ফুটবল সব সময় সেই গল্প বলে না। কখনো কখনো পরাজিতরাও ফিরে আসে বিজয়ীর মতোই ভালোবাসা নিয়ে। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারার পর আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের দেশে ফেরা যেন ছিল সেই আবেগেরই এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। হাতে বিশ্বকাপ নেই, তবু হাজারো সমর্থকের হৃদয়ে তারা ছিলেন বিজয়ী।
সোমবার (২০ জুলাই) দেশে ফেরে আর্জেন্টিনা দল। তবে সেই বহুল প্রতীক্ষিত প্রত্যাবর্তনে একটি বড় অনুপস্থিতি ছিল সবার চোখে। দলের সঙ্গে ফেরেননি অধিনায়ক লিওনেল মেসি। তার পাশাপাশি স্কোয়াডের আরও কয়েকজন সদস্যও ছিলেন না একই ফ্লাইটে। আগেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। স্থানীয় টেলিভিশনের সম্প্রচারেও বিমান থেকে নামতে দেখা যায়নি মেসিকে।
অবশ্য মেসির অনুপস্থিতি সমর্থকদের আবেগে কোনো ভাটা ফেলতে পারেনি। বুয়েনস আইরেসের এজেইজা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্সের বাইরে সকাল থেকেই জড়ো হতে থাকেন হাজারো মানুষ। শীত, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর দীর্ঘ অপেক্ষা—কোনো কিছুই তাদের থামাতে পারেনি। জাতীয় পতাকা কাঁধে, নীল-সাদা ছাতা হাতে তারা অপেক্ষা করেছেন শুধু একবার প্রিয় দলকে দেখার জন্য।
বিমান থেকে নামার পর প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি এবং দলের অন্য সদস্যদের লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সামরিক ব্যান্ডের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেওয়া হয় বিশ্বকাপ রানার্সআপদের।

চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনার রাজপথে নেমেছিল জনসমুদ্র। এবারের দৃশ্য ছিল ভিন্ন। ট্রফি নেই, তাই উন্মাদনাও আগের মতো নয়। কিন্তু কৃতজ্ঞতা ছিল আগের মতোই অটুট। সমর্থকদের চোখে এই দল শুধু একটি ফাইনাল হারেনি; তারা দেশের জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে।
৩৬ বছর বয়সী সমর্থক মার্গা লেদেসমার কণ্ঠে ছিল সেই অনুভূতিরই প্রতিফলন। তার মতে, আর্জেন্টিনাবাসী সব সময় নিজেদের দলকে উদযাপন করবে। বহু বছর ধরে দেশের মানুষকে আনন্দ উপহার দেওয়ার জন্য তিনি লিওনেল মেসির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তাকে জাতীয় দলের জার্সি না ছাড়ার অনুরোধ জানান।
ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের গোলে ১-০ ব্যবধানে হেরে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ হাতছাড়া করে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের আচরণ নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। তবু সমর্থকদের বিশ্বাস, একটি ম্যাচ তাদের দলের পুরো যাত্রাকে ম্লান করতে পারে না।
অনেকের কাছেই এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত ছিল সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারানো। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধের প্রেক্ষাপটে সেই জয় আর্জেন্টাইনদের আবেগকে আরও গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।

টেক্সটাইল কারখানার কর্মী লিওনার্দো বারিয়েন্তোস বলেন, এই দল পুরো দেশকে এক সুতোয় গেঁথেছে। তাই রোদ হোক কিংবা বৃষ্টি, তারা সব সময় দলের পাশে থাকবেন। মেসির উদ্দেশে তার একটাই বার্তা—দেশের জন্য তিনি নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছেন, এজন্য পুরো জাতি তার কাছে কৃতজ্ঞ।
দুই বছরের সন্তানকে নিয়ে দলকে স্বাগত জানাতে আসা মারিয়া ওর্তিজও একই অনুভূতির কথা জানান। তার মতে, স্পেন জয়ের যোগ্য ছিল। তবে আর্জেন্টিনা এই বিশ্বকাপে যে লড়াই উপহার দিয়েছে, সেটাই তাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
হারের বেদনা নিয়েও রোববার রাতে হাজারো সমর্থক বুয়েনস আইরেসের ঐতিহাসিক ওবেলিস্ক চত্বরে জড়ো হন। আতশবাজি, গান আর করতালিতে তারা কৃতজ্ঞতা জানান নিজেদের দলকে। যদিও রাত গভীর হওয়ার পর সেখানে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে। পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় অন্তত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে।
বিশ্বকাপের ট্রফি এবার আর্জেন্টিনার হাতে ওঠেনি। কিন্তু দেশের মানুষের হৃদয়ে দলটির প্রতি ভালোবাসা যে একটুও কমেনি, বিমানবন্দর থেকে ওবেলিস্ক—সব জায়গার দৃশ্যই যেন সেই কথাই নতুন করে প্রমাণ করল।
এসি//