দেশজুড়ে

কক্সবাজার কারাগারে ‘আয়নাবাজি’!

কক্সবাজার প্রতিনিধি

ছবি: সংগৃহীত ফাইল ছবি

কক্সবাজারে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ‘সোনা মিয়া’কে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর পর বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং গত ২৩ জুন র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন।

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান। তিনি অন্য একজনের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে ‘সোনা মিয়া’ পরিচয়ে ওই মামলায় আসামি হয়েছিলেন।

আদালতের নির্দেশে তদন্ত শেষে গত ২ জুলাই প্রতিবেদন জমা দেয় কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ রমজানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছে থাকা জন্মনিবন্ধনের ভিত্তিতে তাকে ‘সোনা মিয়া’ হিসেবে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এমনকি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রেও সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা সঠিক নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

এরপরও ওই পরিচয়ে থাকা ব্যক্তি ২০২২ সালে জামিনে মুক্ত হন। পরে মামলার বিচার শেষে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘সোনা মিয়াসহ’ পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত।

রায়ের পর গত ২৩ জুন র‌্যাব ‘সোনা মিয়া’কে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। তবে কারাগারে যাওয়ার দুই-তিন দিনের মধ্যেই তিনি জেল সুপারের কাছে আবেদন করে জানান, তিনি ওই মামলার আসামি নন।

বিষয়টি আদালতের নজরে এলে কক্সবাজার সদর থানার পুলিশকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে পুলিশ জানায়, ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি ও ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি।

পুলিশের অনুসন্ধানে দুই ব্যক্তির ছবি, পারিবারিক পরিচয় ও শারীরিক শনাক্তকরণ চিহ্নে একাধিক অমিল পাওয়া গেছে। ২০২০ সালের মামলার নথিতে থাকা ব্যক্তির স্ত্রী, সন্তান ও অন্যান্য পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে বর্তমানে কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার তথ্যেরও কোনো মিল পাওয়া যায়নি।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, রমজান ও প্রকৃত সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করতেন। পরে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় তারা একই কক্ষে থাকতেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর মামলার তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান অভিযোগ করেছেন, তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রেই আসামির নাম-ঠিকানা নিয়ে অসঙ্গতির বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন। এরপরও প্রকৃত পরিচয় যাচাই না করায় তদন্তে গুরুতর গাফিলতি হয়েছে।

তার দাবি, এই সুযোগে প্রকৃত আসামি জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে চলে যান। অন্যদিকে একই নামে থাকা একজন ব্যক্তি এখন সেই মামলার মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে কারাগারে রয়েছেন।

কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস দাবি করেছেন, তার স্বামীর বিরুদ্ধে এর আগে কোনো মামলা ছিল না এবং তিনি কখনো কারাগারেও যাননি। তার স্বামী রামুর বাসিন্দা এবং রমজান নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় ছিল।

জান্নাতুলের দাবি, ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি ছিলেন ওই রমজান। ভুল পরিচয়ের কারণে তার স্বামীকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। তিনি স্বামীর আইনি সহায়তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

পুলিশের প্রতিবেদনে দুই ব্যক্তি আলাদা বলে প্রমাণ পাওয়ার পর এখন মামলার পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া এবং প্রকৃত আসামির বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই দেখার বিষয়।

 

এমএ//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #কক্সবাজার #কক্সবাজার কারাগার