জাতীয়

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু, কী কী সুযোগ-সুবিধা পান তিনি?

বায়ান্ন প্রতিবেদন

রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে তাঁর অবস্থান। রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অনেক কার্যক্রমও রাষ্ট্রপতির নামে পরিচালিত হয়। তবে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান হলেও সরকারপ্রধান নন। ফলে পদটির মর্যাদা ও সাংবিধানিক গুরুত্ব অনেক বেশি হলেও নির্বাহী ক্ষমতার বড় অংশই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকারের হাতে।

এ কারণে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়ে প্রায়ই কৌতূহল তৈরি হয়—কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কোথায় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসরণ করতে হয় এবং রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা পান?

সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির হাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকলেও অধিকাংশ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।

দুটি নিয়োগে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব ক্ষমতা

সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের ৩ দফা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। এই দুটি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতি তাঁর অন্য সব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন।

সংসদ নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে সাধারণত সেই দলের সংসদীয় দলের নেতাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। তবে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনে কে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন পেতে পারেন, তা নির্ধারণে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মেনে চলতে হয় না। সংবিধান এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীন ক্ষমতা দিয়েছে।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রনীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত রাখেন। রাষ্ট্রপতি কোনো বিষয় মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য পাঠাতে বললে প্রধানমন্ত্রী তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করেন।

তবে রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর কোনো পরামর্শ নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না কিংবা কী পরামর্শ দিয়েছেন—এ বিষয়ে কোনো আদালত তদন্ত করতে পারেন না।

দণ্ড মওকুফের ক্ষমতাও রয়েছে

রাষ্ট্রপতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা হলো দণ্ড মার্জনা বা কমানোর সুযোগ। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের দেওয়া দণ্ড রাষ্ট্রপতি মার্জনা, স্থগিত, হ্রাস কিংবা সম্পূর্ণ মওকুফ করতে পারেন।

তবে সংসদীয় সরকারব্যবস্থার কাঠামোর মধ্যে রাষ্ট্রপতির অন্যান্য দায়িত্বের মতো এ ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সরকারের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ।

দায়িত্ব পালনে বিশেষ দায়মুক্তি

রাষ্ট্রপতির পদটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সাংবিধানিক দায়মুক্তি। দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কোনো আদালতে ফৌজদারি মামলা করা যায় না। তাঁকে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোর জন্যও আদালত থেকে পরোয়ানা জারি করা যায় না।

তবে এই দায়মুক্তির অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্রপতিকে কোনো পরিস্থিতিতেই পদ থেকে সরানো সম্ভব নয়। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় তাঁকে অভিশংসন করা যেতে পারে। শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণেও তাঁকে অপসারণের বিধান রয়েছে।

অভিশংসনের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাক্ষরযুক্ত অভিযোগ স্পিকারের কাছে জমা দিতে হয়। এরপর নির্ধারিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগ সংসদে বিবেচিত হয়। রাষ্ট্রপতির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও রয়েছে। অভিযোগের পক্ষে সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পড়লে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়।

শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরনের সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সমন্বয়ে বোর্ড গঠন করে রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ২০০২ সালে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি পদত্যাগ করেন।

রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরে যাওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক দায়মুক্তি প্রযোজ্য থাকে না।

মেয়াদ পাঁচ বছর, সর্বোচ্চ দুইবার

রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে উত্তরাধিকারী দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিদায়ী রাষ্ট্রপতি দায়িত্বে বহাল থাকেন। একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে আবদুল হামিদ পরপর দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

রাষ্ট্রপতি পদে থাকা অবস্থায় কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য থাকতে পারেন না। কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দায়িত্ব গ্রহণের দিন তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যায়। ফলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব নিলে তাঁর সংসদীয় আসনও শূন্য হবে এবং পরে সেখানে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

রাষ্ট্রপতি হতে হলে প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হয়। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতাও থাকতে হবে। তবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য সংসদ সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। আগে অভিশংসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকলে তিনি পুনরায় এ পদে প্রার্থী হতে পারবেন না।

এবারের নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ সংসদ সদস্য নন। তাই তিনি ভোট দিতে পারবেন না এবং ভোটকেন্দ্র হিসেবে নির্ধারিত সংসদ কক্ষেও তাঁর প্রবেশের সুযোগ নেই। অন্যদিকে সংসদ সদস্য হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভোট দিতে পারবেন।

জনগণের সরাসরি ভোটে নয়

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। জাতীয় সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একজন সংসদ সদস্য কোনো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করেন এবং আরেকজন সংসদ সদস্য তা সমর্থন করেন। একমাত্র বৈধ প্রার্থী থাকলে তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।

একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। দুই প্রার্থী সমান ভোট পেলে সংবিধানের বিধান অনুযায়ী লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের ব্যবস্থা রয়েছে।

দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর একাধিক প্রার্থী থাকায় এবার রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি ভোট হচ্ছে। পুরো নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা

রাষ্ট্রপতির বেতন ও সুযোগ-সুবিধা নির্ধারিত হয়েছে সংশ্লিষ্ট আইনে। বর্তমানে রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই বেতন আয়করমুক্ত। ২০১৬ সালে সর্বশেষ রাষ্ট্রপতির বেতন বাড়ানো হয়। এর আগে মাসিক বেতন ছিল ৬১ হাজার ২০০ টাকা।

তুলনায় প্রধানমন্ত্রীর মাসিক বেতন ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা।

রাষ্ট্রপতির জন্য সরকারি বাসভবন হিসেবে নির্ধারিত রয়েছে বঙ্গভবন। এর সাজসজ্জা, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বহন করা হয়। সরকারি দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রপতির জন্য গাড়ি ও প্রয়োজনীয় পরিবহন সুবিধাও থাকে।

রাষ্ট্রীয় কাজে বিদেশ সফরের সময় সরকার নির্ধারিত হারে ভাতাও পান রাষ্ট্রপতি।

বছরে দুই কোটি টাকার স্বেচ্ছাধীন তহবিল

রাষ্ট্রপতির জন্য রয়েছে স্বেচ্ছাধীন তহবিল। বছরে এই তহবিলের পরিমাণ দুই কোটি টাকা। রাষ্ট্রপতির বিবেচনায় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেওয়ার কাজে এ অর্থ ব্যয় করা যায়।

রাষ্ট্রপতি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও বিশেষ সুবিধা রয়েছে। দেশের যেকোনো হাসপাতালে তাঁদের বিনা খরচে চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শে বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সেই ব্যয়ও সরকার বহন করে।

এ ছাড়া রাষ্ট্রপতির বিমানভ্রমণের জন্য বিমা সুবিধা রয়েছে। বর্তমানে এ সুবিধার পরিমাণ বছরে ২৭ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের আগে এর পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ টাকা।

রাষ্ট্রপতির আপ্যায়ন বা বিনোদনমূলক ব্যয়ের জন্যও বার্ষিক ভাতা রয়েছে।

অর্থাৎ বেতন ছাড়াও সরকারি বাসভবন, গাড়ি, চিকিৎসা, বিদেশ সফর, আপ্যায়ন এবং বিমানভ্রমণসংক্রান্ত বিভিন্ন সুবিধা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সঙ্গে যুক্ত।

রাষ্ট্রপ্রধান, কিন্তু সরকারপ্রধান নন

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বুঝতে হলে বাংলাদেশের সংসদীয় সরকারব্যবস্থার কাঠামোটি মনে রাখা জরুরি। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকলেও সরকারের নির্বাহী প্রধান নন। সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।

তাই রাষ্ট্রপতির পদটি একদিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মর্যাদার প্রতীক, অন্যদিকে নির্বাহী ক্ষমতার দিক থেকে তুলনামূলকভাবে সীমিত।

তবে জাতীয় নির্বাচন বা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে সংসদে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তাঁর দায়িত্বের গুরুত্ব বাড়ে।

আর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা রাষ্ট্রপতি কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

 

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান—মর্যাদায় সর্বোচ্চ, কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্থার কারণে নির্বাহী ক্ষমতায় সীমিত। তাঁর পদে আনুষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক গুরুত্বের পাশাপাশি রয়েছে উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা, যা দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অব্যাহত থাকে।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #রাষ্ট্রপতি #বঙ্গভবন