ফিচার

আজ মীনা দিবস, শিশুদের ভাবনায় পরিবর্তন এনেছিল যে কার্টুন

ফিচার ডেস্ক

শৈশব মানেই খেলাধুলা, নতুন কিছু শেখার আনন্দ আর কৌতূহল নিয়ে পৃথিবীকে চেনার সময়। তবে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও শিক্ষার সুযোগের অভাবে অনেক শিশুর সেই স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হয়। শিশুদের এমন নানা বাস্তবতা ও অধিকার সহজ গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরেছিল জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্র মীনা। তাই দক্ষিণ এশিয়ার শিশুদের কাছে মীনা শুধু বিনোদনের চরিত্র নয়, সচেতনতারও প্রতীক।

আজ ২৪ সেপ্টেম্বর মীনা দিবস। শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অধিকার ও সমতার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই প্রতিবছর এ দিবসটি পালিত হয়।

মীনার জন্ম যেভাবে

১৯৯০ থেকে ২০০০ সালকে ‘মেয়েশিশুর দশক’ ঘোষণা করেছিল দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা। ওই সময়ে মেয়েশিশুদের শিক্ষা ও অধিকার নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে জাতিসংঘের শিশু তহবিল কার্টুনভিত্তিক একটি ধারাবাহিক তৈরির উদ্যোগ নেয়। সেই উদ্যোগ থেকেই তৈরি হয় মীনা চরিত্র।

মীনা নয় বছরের একটি মেয়ে। তার সঙ্গে রয়েছে ছোট ভাই রাজু এবং পোষা টিয়াপাখি মিঠু। মীনার বিভিন্ন গল্পে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া, শিশুর অধিকার, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সামাজিক বৈষম্যের মতো বিষয় উঠে আসে।

কখনো শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে লড়াই করতে দেখা যায় মীনাকে, আবার কখনো মেয়েশিশুর প্রতি বৈষম্যের প্রতিবাদ করে সে। কোনো গল্পে গুরুত্ব পায় স্বাস্থ্যবিধি, নিরাপদ পানি ও পুষ্টিকর খাবার। শিশুদের উপযোগী সহজ ও আনন্দদায়ক গল্পের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয় তুলে ধরাই ছিল মীনা কার্টুনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

বাংলাদেশে মীনার যাত্রা

বাংলাদেশে মীনা কার্টুনের প্রথম পর্ব প্রচারিত হয় ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে। ‘মুরগিগুলো গুনে রাখো’ শিরোনামের ওই পর্বে স্কুলে যাওয়ার জন্য মীনার সংগ্রামের গল্প তুলে ধরা হয়।

প্রচারের পর অল্প সময়ের মধ্যেই শিশুদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে মীনা। টেলিভিশনের পাশাপাশি কমিক বই, বেতার অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রমেও ছড়িয়ে পড়ে তার গল্প। ফলে বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে শিশুদের শেখার জগতের সঙ্গেও যুক্ত হয় চরিত্রটি।

দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে জনপ্রিয়তা

বাংলাদেশের বাইরে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও মীনার গল্প স্থানীয় ভাষায় প্রচারিত হয়েছে। ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির শিশুদের কাছেও চরিত্রটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর অন্যতম কারণ, মীনার গল্পে তুলে ধরা সমস্যাগুলো ছিল শিশুদের পরিচিত বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

মেয়েশিশুর শিক্ষা, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সামাজিক বৈষম্যের মতো বিষয় উঠে এসেছে বিভিন্ন পর্বে। বিশেষ করে মেয়েদের পড়াশোনার অধিকার ও সমতার বার্তা মীনার গল্পে গুরুত্ব পেয়েছে। এসব গল্প শিশুদের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকেও বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

কেন ২৪ সেপ্টেম্বর মীনা দিবস

১৯৯৮ সাল থেকে প্রতিবছর ২৪ সেপ্টেম্বর মীনা দিবস পালিত হয়ে আসছে। মেয়েশিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া কমানো এবং শিশুদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়গুলো এ দিবসের অন্যতম গুরুত্ব।

তবে মীনা দিবস কেবল একটি কার্টুন চরিত্রকে স্মরণ করার দিন নয়। প্রতিটি শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনে এই দিবস।

বদলেছে সময়, প্রাসঙ্গিক মীনার বার্তা

মীনার যাত্রা শুরু হয়েছিল কয়েক দশক আগে। এর মধ্যে শিশুদের জীবনযাপন ও বিনোদনের মাধ্যমেও এসেছে বড় পরিবর্তন। টেলিভিশনের পাশাপাশি এখন স্মার্টফোন ও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে শিশুদের বড় একটি সময় কাটে।

তবে মেয়েশিশুর শিক্ষা, বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রম, স্বাস্থ্য ও সামাজিক বৈষম্যের মতো বিষয় এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তাই সময় ও মাধ্যম বদলালেও মীনার গল্পে উঠে আসা বার্তাগুলোর প্রাসঙ্গিকতা রয়ে গেছে।

একটি শিশুর স্কুলে যাওয়ার অধিকার, নিজের মত প্রকাশের সুযোগ এবং নিরাপদ শৈশবের প্রয়োজন আজও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই কারণেই মীনা শুধু পর্দার একটি কার্টুন চরিত্র নয়। বহু শিশুর কাছে সে সাহস করে প্রশ্ন করতে শেখা এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে জানার পরিচিত এক বন্ধু। মীনা দিবস সেই বার্তাই আবার মনে করিয়ে দেয়—লিঙ্গ, পারিবারিক অবস্থা বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে কোনো শিশুর শিক্ষা ও স্বপ্ন যেন বাধাগ্রস্ত না হয়।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #মীনা #শৈশব