ফিচার

আজ জাতীয় কন্যা শিশু দিবস

বায়ান্ন প্রতিবেদন

সকালে স্কুলের পোশাক পরে বই-খাতা হাতে বাড়ি থেকে বের হয় মেয়েটি। শ্রেণিকক্ষে বসে পড়াশোনা করে, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায়, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ সবার জন্য সমান দীর্ঘ হয় না। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিকে উঠতেই অনেক কন্যাশিশুর হাতে থাকা বই একসময় বন্ধ হয়ে যায়। স্কুলের বদলে তাদের সামনে এসে দাঁড়ায় বিয়ের আয়োজন, সংসারের দায়িত্ব কিংবা সামাজিক নানা বাধা।

আজ ৩০ সেপ্টেম্বর, জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। এই দিনে দেশের কন্যাশিশুদের শিক্ষা ও অগ্রগতির দিকে তাকালে একই সঙ্গে দেখা যায় সাফল্য ও উদ্বেগের দুটি চিত্র।

একদিকে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ, উপবৃত্তি ও শিক্ষা সহায়তার কারণে বিদ্যালয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলে ও মেয়েদের বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণে প্রায় সমতাও অর্জিত হয়েছে। অর্থাৎ স্কুলে মেয়েদের পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে।

তবে প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়—স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর কতজন মেয়ে শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে?

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য বলছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার প্রায় ৩০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি—৩৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ সন্তোষজনক হলেও মাধ্যমিকে পৌঁছানোর পরই তাদের একটি বড় অংশ শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ছে।

এই ঝরে পড়ার পেছনে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাল্যবিবাহ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৭১ শতাংশ মেয়ে বাল্যবিবাহের কারণে পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একটি মেয়ের হাতে বই থাকার কথা যে বয়সে, সেই বয়সেই অনেকের হাতে তুলে দেওয়া হয় সংসারের দায়িত্ব।

ফলে কন্যাশিশুর শিক্ষার প্রশ্নটি শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। মেয়েটিকে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসার পর তাকে সেখানে ধরে রাখাটাই হয়ে উঠছে বড় চ্যালেঞ্জ।

একটি মেয়ে যত বেশি সময় শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকে, ততই তার সামনে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার পরিধি বাড়ে। শিক্ষা তাকে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেয় না; নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া, নিজের অধিকার সম্পর্কে জানা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করার সুযোগও তৈরি করে।

আর সেই শিক্ষাজীবন যদি বাল্যবিবাহের কারণে মাঝপথে থেমে যায়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু একজন শিশুর নয়। এর প্রভাব পড়ে পরিবার, সমাজ এবং শেষ পর্যন্ত দেশের উন্নয়নেও।

তাই কন্যাশিশুর শিক্ষায় পরবর্তী অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি বাড়ানো নয়; বরং মাধ্যমিক পর্যন্ত তাদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখা। প্রয়োজন নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ, বিদ্যালয়ে ধরে রাখার কার্যকর ব্যবস্থা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আরও শক্তিশালী উদ্যোগ।

জাতীয় কন্যাশিশু দিবস তাই শুধু অর্জনের হিসাব মেলানোর দিন নয়। একই সঙ্গে ভাবার দিন—যে মেয়েটি বই হাতে স্কুলে যাচ্ছে, তার সেই পথ যেন মাধ্যমিকের দরজায় এসে থেমে না যায়।

কারণ একটি কন্যাশিশুর শিক্ষাজীবন যত দীর্ঘ হবে, তার নিজের ভবিষ্যৎ যেমন বদলাবে, তেমনি বদলানোর সুযোগ তৈরি হবে একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি দেশেরও।