জাতীয়

আজ ও কাল মহাসপ্তমী

বায়ান্ন প্রতিবেদন

মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাক ও কাঁসরের বাদ্য। ফুল, ধূপ ও আগরবাতির সুবাসে মুখর চারপাশ। শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে চলছে দেবী দুর্গার আরাধনা। প্রতিমা দর্শন, প্রার্থনা ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপন করছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। মহাষষ্ঠীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে শনিবার (১৭ অক্টোবর) শুরু হয়েছে মহাসপ্তমীর পূজা। এ বছর বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী, মহাসপ্তমী তিথি শনিবার ও রবিবার—দুই দিনজুড়ে থাকায় পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা ঘিরে রয়েছে বাড়তি আয়োজন।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপে চলছে ধর্মীয় সংগীত পরিবেশনা। মাটির প্রদীপ, মোমবাতি ও বৈদ্যুতিক আলোর সাজে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে প্রতিমা। দেবী দুর্গার পাশাপাশি লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমা দর্শনে ভিড় করছেন নানা বয়সের মানুষ। প্রার্থনায় ভক্তরা কামনা করছেন শান্তি, শক্তি, সম্প্রীতি ও সবার কল্যাণ।

তবে মহাসপ্তমী কেবল পূজার আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নবপত্রিকা, মহাস্নান ও মহিষাসুর বধের পৌরাণিক কাহিনির মধ্য দিয়ে উঠে আসে প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা, আত্মশুদ্ধি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয়ের বার্তা।

নবপত্রিকায় প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা

মহাসপ্তমীর অন্যতম প্রধান আচার নবপত্রিকা স্থাপন, যা সাধারণভাবে ‘কলাবউ’ নামে পরিচিত। কলাগাছের সঙ্গে কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ একত্রে বেঁধে স্নান করানো হয়। পরে নতুন শাড়িতে সাজিয়ে তা পূজামণ্ডপে স্থাপন করা হয়।

ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, নবপত্রিকার নয়টি উদ্ভিদ দেবীর নয়টি শক্তির প্রতীক। পূজার এই রীতিতে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কও প্রকাশ পায়। খাদ্য, চিকিৎসা ও কৃষিকাজসহ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে এসব উদ্ভিদের ভূমিকা রয়েছে।

নবপত্রিকার শিক্ষা তাই শুধু পূজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গাছপালা রক্ষা, জলাশয় দূষণমুক্ত রাখা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার মধ্য দিয়েও প্রকৃতির প্রতি মানুষের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব।

মহাস্নানে শুদ্ধতার শিক্ষা

মহাসপ্তমীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আচার দেবীর মহাস্নান। এ সময় দর্পণে দেবীমূর্তির প্রতিফলন ঘটিয়ে গঙ্গাজল, দুধ, মধু ও সুগন্ধি উপাচারে স্নানের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাসে এই আচার বাহ্যিক ও আত্মিক শুদ্ধতার প্রতীক।

এই শুদ্ধতার শিক্ষা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনেও প্রাসঙ্গিক। অন্যের অধিকার হরণ, বৈষম্য, অহংকার ও হিংসা থেকে দূরে থাকা এবং ন্যায়নীতি অনুসরণ করা জরুরি। একই সঙ্গে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মধ্য দিয়েই মানবিক মূল্যবোধের বাস্তব প্রকাশ ঘটে।

মহিষাসুর বধে অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয়

দুর্গাপূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুর বধের পৌরাণিক কাহিনি। এই কাহিনি শুভ ও অশুভ শক্তির সংঘাত এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

দেবীর দশ হাত ও বিভিন্ন অস্ত্র অন্যায়ের মোকাবিলা করার শক্তিকে নির্দেশ করে। তার পাশে থাকা লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ সমৃদ্ধি, জ্ঞান, বীরত্ব ও বুদ্ধির প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে শক্তির সঙ্গে প্রজ্ঞা, সাহসের সঙ্গে ন্যায়বোধ এবং সমৃদ্ধির সঙ্গে জ্ঞানের সমন্বয়ের শিক্ষা পাওয়া যায়।

দেবীর আগমনে পারিবারিক বন্ধন ও কর্মচাঞ্চল্য

বাঙালির সংস্কৃতিতে দেবী দুর্গার আগমন শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়, পিতৃগৃহে কন্যার ফিরে আসার আবেগের সঙ্গেও যুক্ত। এ কারণে দুর্গোৎসবকে ঘিরে ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনও দৃঢ় হয়।

এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু মানুষের জীবিকা। প্রতিমাশিল্পী, মৃৎশিল্পী, ঢাকি, আলোকসজ্জাকর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কর্মচাঞ্চল্য বাড়ে। পূজার আয়োজন ঘিরে তৈরি হয় কেনাকাটা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মানুষের মিলনমেলা।

রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপে এবারও রয়েছে নানা ধরনের সাজসজ্জা। গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা উদযাপন পরিষদের মণ্ডপের এবারের বিষয়বস্তু ‘জলজ’। এর নির্মাতা শিল্পী পার্থ জানান, জল থেকেই সবকিছুর উৎপত্তি। দেবী জলের মধ্য থেকে আসবেন এবং জলের মধ্যেই ফিরে যাবেন—এই ভাবনা থেকেই মণ্ডপের এমন নামকরণ।

দেশজুড়ে পূজার আয়োজন, বেড়েছে মণ্ডপের সংখ্যা

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৮৫১টিতে। দুর্গাপূজার সরকারি অনুদানও চার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ কোটি টাকা করা হয়েছে।

পঞ্জিকা অনুযায়ী, এবার দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে আসবেন এবং নৌকায় চড়ে স্বর্গলোকে ফিরে যাবেন। অন্যদিকে, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি বাড়িয়ে তিন দিন করা হয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের ছুটি মিলছে।

শুক্রবার মহাষষ্ঠীর কল্পারম্ভের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এ সময় বেলগাছের নিচে ঘট স্থাপন করে দেবী দুর্গাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সন্ধ্যায় বোধন ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় দেবীকে আহ্বানের আনুষ্ঠানিকতা।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিত বরুণ চক্রবর্তী জানান, কল্পারম্ভে পূজার সংকল্প করা হয়। বেলগাছে দেবীর আগমন কল্পনা করে সেখানে পূজা দেওয়া হয়। পরে সন্ধ্যায় বোধন ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে দেবীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির ছাড়াও রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ, রমনা কালীমন্দির ও আনন্দময়ী আশ্রম, বরোদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির, গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজামণ্ডপ এবং পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার ও লালবাগ ঋষিপাড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলছে দুর্গোৎসবের আয়োজন।

শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে দুর্গাপূজাকে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তার মতে, এই উৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও অংশ। তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় হওয়ার কামনা করেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে বলেন, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার সব ধর্মেরই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। নিজ নিজ ধর্মীয় বিধান ও সংস্কৃতি পালনের পাশাপাশি মানুষের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মান ও সহমর্মিতা বজায় রাখা জরুরি। তিনি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব সনাতন ধর্মাবলম্বীকে দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানান।

সম্প্রীতি ও নিরাপত্তাই উৎসবের মূল বার্তা

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সব ধর্মের মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত।

মহাসপ্তমীর পূজায় প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা, আত্মশুদ্ধি ও শুভশক্তির জয়ের যে বার্তা রয়েছে, তা দৈনন্দিন জীবনেও অনুসরণ করার সুযোগ রয়েছে। উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও পরিবেশ রক্ষা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার শিক্ষা যেন মানুষের আচরণে বজায় থাকে। এভাবেই দুর্গোৎসবের ধর্মীয় তাৎপর্য ছাপিয়ে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির বার্তা সমাজে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #দেবী দুর্গা #দুর্গোৎসব