দেশের বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন ক্ষেত্র তিতাসে দুটি নতুন অনুসন্ধানমূলক ও উন্নয়ন কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ নামের কূপ দুটি খননে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯২ কোটি টাকা। কূপ দুটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ লাখ ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
‘তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দুটি অনুসন্ধানমূলক ও উন্নয়ন কূপ (তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩) খনন’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের কথা রয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) এ তথ্য জানান।
বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠেয় সভায় সভাপতিত্ব করবেন একনেকের চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে পেট্রোবাংলার আওতাধীন বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। প্রকল্পটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থেকে ৪১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানান, নতুন কূপ দুটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ লাখ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের পাশাপাশি ১৮ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়াতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন বাড়লে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এরপর ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানান আব্দুল মান্নান।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, কূপ দুটি থেকে ১০ বছরে প্রায় ১০০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং ৬০ হাজার ৪৪৪ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে।
কোম্পানির বর্তমান উৎপাদনস্থলের মূল্য বা ওয়েলহেড মূল্য ধরে উৎপাদিত গ্যাস ও কনডেনসেটের মোট আনুমানিক মূল্য ৩৩৯ কোটি ৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে গ্যাসের মূল্য ২৮৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং কনডেনসেটের মূল্য ৫৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা। তবে ভোক্তা পর্যায়ের গ্যাসের দাম বিবেচনায় নিলে একই সময়ে উৎপাদিত গ্যাসের আনুমানিক মূল্য দাঁড়াবে ৬ হাজার ৫২৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
বিজিএফসিএল বর্তমানে তাদের ছয়টি উৎপাদনশীল গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে পাঁচটি থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৮০ থেকে ৪৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে। কোম্পানিটির সবচেয়ে বড় তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে খনন করা ২৮টি কূপের মধ্যে ২৩টি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে।
২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে পরিচালিত ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের তথ্য পর্যালোচনা করে নতুন কূপ খননের প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের জন্য বিজিএফসিএল চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (সিএনপিসি) প্রতিষ্ঠান বিজিপি ইনকরপোরেটেডকে নিয়োগ দিয়েছিল। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে ১৬টি নতুন কূপ এবং সাতটি গভীর কূপ খননের সুপারিশ করে।
স্থলভাগে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের সরকারি পরিকল্পনার আওতায় তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ কূপকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় বিদেশি ঠিকাদারের মাধ্যমে কূপ দুটি খনন, দেশি ও বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ, গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন স্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজ করা হবে।
ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি) ২০২৬ সালে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করে। পরিকল্পনা কমিশনের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এলএনজি আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা যাবে। পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ার ফলে শিল্পোন্নয়নেও সহায়তা মিলবে।
এর আগে ২০২৬ সালের ১৮ জুন অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় প্রকল্পের ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত ৬৩২ কোটি টাকা থেকে ৪০ কোটি টাকা কমিয়ে প্রকল্পের ব্যয় ৫৯২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সূত্র: বাসস
এসি//