মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির চুম্বনের ভিডিও ছড়িয়ে সৌদিতে জেল খাটছেন ভারতীয় যুবক
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির চুম্বনের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের অভিযোগে ২০২৩ সাল থেকে কারাগারে রয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের এক অভিবাসী শ্রমিক। দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর ওই শ্রমিকের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে তার পরিবারের।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারাবন্দী ওই শ্রমিকের নাম সাহাবুদ্দিন শেখ। তিনি মুর্শিদাবাদের বালারামপুর গ্রামের বাসিন্দা। পুলিশ সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কাজ করছিলেন সাহাবুদ্দিন। মক্কার একটি মসজিদে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় দুই বাংলাদেশিকে চুম্বনরত অবস্থায় দেখেন তিনি।
অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে উপস্থিত পাকিস্তানের এক যুবক সাহাবুদ্দিনের মুঠোফোন ব্যবহার করে ওই দৃশ্য ধারণ করেন। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এ ঘটনায় সাহাবুদ্দিনকেও গ্রেপ্তার করে সৌদি পুলিশ। ২০২৩ সাল থেকে টানা প্রায় তিন বছর ধরে তিনি দেশটির কারাগারে রয়েছেন।
সাহাবুদ্দিনের পরিবারের দাবি, নিছক মজা করার উদ্দেশ্যেই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছিল। এর পরিণতি এতটা গুরুতর হতে পারে, তা সাহাবুদ্দিন বা তার সঙ্গীরা কেউই ভাবতে পারেননি।
সাহাবুদ্দিনের মা কোহিনুর বিবি বলেন, ‘ও বড় কোনও অপরাধ তো করেনি। একটা ভিডিও ছেড়েছে বলে এভাবে জেল খাটতে হচ্ছে!’
তিনি জানান, গত আট বছর ধরে সৌদি আরবে কাজ করছিলেন তার ছেলে। সাহাবুদ্দিনই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বিদেশ থেকে তার পাঠানো অর্থেই সংসার চলত। কিন্তু ছেলে কারাগারে বন্দী থাকায় পরিবারটি এখন আর্থিক সংকটে পড়েছে। কোনো রকমে দিন কাটছে তাদের।
সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর ছেলের পরিণতি নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে কোহিনুর বিবির।
নিজের শঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের কী হবে জানি না। ভয়ে ভয়ে আছি।’
সাহাবুদ্দিনের পরিবার জানিয়েছে, তাকে সৌদি আরবের কারাগার থেকে মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হয়েছে। তবে এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
সৌদি আরবের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির নাম নজরুল ইসলাম আবদুল বশির ও সুইটি আখতার। মক্কা অঞ্চলে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়ে মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘন’ করেছেন তারা।
গত ১৪ অক্টোবরের দিকে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে আগের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কী ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাদের দণ্ড দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিস্তারিত জানায়নি।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় মামলাটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে সৌদি সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। তাদের বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ ছিল, কীভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তাদের মরদেহ কোথায় রাখা হয়েছে এবং বিচার চলাকালে তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন কি না—এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে। ধর্মীয় সম্পর্ক ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক বন্ধনের কারণে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সৌদি আরবে ৩০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি বসবাস ও কাজ করেন, যাদের বেশির ভাগই স্বল্প বেতনের পেশায় নিয়োজিত। দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিবিসি আরও জানিয়েছে, সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই দুই বাংলাদেশিকে ‘তাজির’ আইনের আওতায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ইসলামী আইনে তাজির বলতে এমন শাস্তিকে বোঝায়, যার ধরন ও মাত্রা নির্ধারণের ক্ষমতা বিচারকের বিবেচনার ওপর নির্ভর করে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত পশ্চিমবঙ্গের অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা মতিউর রহমান দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন, সাহাবুদ্দিনের পরিবারের সদস্যরা তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ জানিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সৌদি আরবে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
মতিউর রহমান বলেন, ‘সাহাবুদ্দিনের পরিবারের সদস্যরা তাকে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ জানিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করেছেন। ঘটনাটি ২০২৩ সালের। এরপর থেকে তিনি সৌদি আরবের কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন। আমি আমাদের দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সৌদি আরবে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তাঁকে কারাবাসের মুখোমুখি হতে হবে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। দিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ভারতীয় দূতাবাসের জবাবের অপেক্ষায় আছি।’
এসি//