দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনে থাকা ইরানের সবচেয়ে পরিচিত রাজনৈতিক মুখের নাম রেজা পাহলভি। যুদ্ধবিমানের সাবেক এই পাইলট, যিনি বহু বছর ধরে ইরানে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ পরিবর্তনের জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পক্ষে সরব ছিলেন, সম্প্রতি নিজস্ব আহ্বানে নাটকীয় পরিবর্তন এনেছেন। গত সপ্তাহান্তে তিনি বিক্ষোভকারীদের বিক্ষোভকারীদের ইরান শহরের কেন্দ্রস্থল নিয়ন্ত্রণে নেয়ার ডাক দেন।
ময়ূরসিংহাসনের ৬৫ বছর বয়সী এ উত্তরাধিকারের এমন ডাক ইরানের বর্তমান সরকারের দিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে রেজা পাহলভি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা “শহরের কেন্দ্রস্থলগুলো নিয়ন্ত্রণে নিন” এবং “আমার প্রত্যাবর্তনের জন্য” প্রস্তুতি নিন।’ ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম তার এ আহ্বানকে ‘সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা’ বলে বর্ণনা করেছে।
পাহলভি তার বিবৃতিতে বলেন, ‘এখন আর শুধু রাস্তায় নামা আমাদের লক্ষ্য নয়। বরং শহরের কেন্দ্রস্থল দখল করা এবং তা ধরে রাখার প্রস্তুতি নেয়াই এখন আমাদের লক্ষ্য।’

উত্তরাধিকারী থেকে নির্বাসনে
রেজা পাহলভি ১৯৬০ সালের ৩১ অক্টোবর তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের সাত বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সমন্বিতভাবে ইরানের তৎকালীন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়। মোসাদ্দেক ক্ষমতা গ্রহণ করে অ্যাংলো-পার্সিয়ান জ্বালানি তেলের কোম্পানি জাতীয়করণ করেন। ১৯৫১ সাল থেকে কোম্পানিটি বিপি নামে পরিচিত।
ছয় বছর বয়সে পাহলভিকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুবরাজ, তথা রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকার ঘোষণা করা হয়। সবকিছু দেখে মনে হয়েছিল, তিনিই ইরানের পরবর্তী শাহ হতে যাচ্ছেন। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব সব হিসাব বদলে দেয়। তার বাবা মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি বিপ্লবের মুখে দেশ থেকে পালিয়ে যান।
পাহলভি ১৭ বছর বয়সে যুদ্ধবিমান পরিচালনার প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের রিস বিমানবাহিনী ঘাঁটিতে তিনি প্রশিক্ষণ নেন। এর দুই বছরের মাথায় রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। গড়ে ওঠে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা। নতুন সরকার তার দেশে ফেরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
প্রশিক্ষণ শেষে রেজা পাহলভি যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক করেন। ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি মাতৃভূমি ইরানের হয়ে স্বেচ্ছাসেবক পাইলট হিসেবে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে।
এর পর থেকে স্ত্রী ইয়াসমিন পাহলভিকে নিয়ে পাহলভি যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। তাদের তিন কন্যাসন্তান রয়েছে।
‘নিচ্ছেন মাতৃভূমিতে ফেরার প্রস্তুতি’
রেজা পাহলভি ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে ইরানে গণভোট ও অহিংস পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলে আসছিলেন। তবে ইরানে চলমান বিক্ষোভকে ঘিরে তার বক্তব্যের সুর চড়া হয়ে উঠেছে।
গত শনিবার রেজা পাহলভি পরিবহন, তেল ও গ্যাসসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতের শ্রমিকদের প্রতি দেশজুড়ে ধর্মঘটের আহ্বান জানান। তার ভাষায়, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের ‘আর্থিক জীবনরেখা’ বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি সাবেক অমর রক্ষীবাহিনী (ইমোর্টাল গার্ড) খ্যাত সাম্রাজ্যবাদী বাহিনী এবং বর্তমান নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রতি পক্ষত্যাগের আহ্বান জানান।
রেজা পাহলভি বলেন, ‘আমি নিজেও মাতৃভূমিতে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছি, যাতে করে আমাদের জাতীয় বিপ্লবের বিজয়ের মুহূর্তে আপনাদের পাশে থাকতে পারি।’
এমন এক সময়ে এ আহ্বান এল, যখন ইরানে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভের খবর পাওয়া যাচ্ছে। পাহলভি তার সমর্থকদের ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগের ‘সিংহ ও সূর্য’ খচিত পতাকা উত্তোলনের আহ্বান জানান। এটা তার পিতা মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির শাসনামলের পতাকা। ইরানের স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে উল্লেখযোগ্য সব জনপরিসর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

রেজা পাহলভিকে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা
তেহরান রেজা পাহলভির কঠোর আন্দোলনের ডাকের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। পরের দিন গত রোববার ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে ‘রাজপুত্রের’ আহ্বানকে ‘নিরাপত্তাহীনতার নতুন পর্যায়’ এবং ‘অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র যুদ্ধ’ বলে উল্লেখ করা হয়।
ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিমের বরাতে দেশটির রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াতানে ইমরোজের’ এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’–এর ওপর পাহলভির হামলার আহ্বান ‘সন্ত্রাসবাদের চরমবিন্দু’।
ওয়াতানে ইমরোজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ভুল বোঝার অবকাশ নেই। এটি কেবল দাঙ্গা নয়… এসব বরং সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা।’ একই প্রতিবেদনে নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কিছু সদস্য নিহত হওয়ার দাবি করা হয়।
ইরানের সরকারি কর্মকর্তারা পাহলভির উসকানিমূলক আহ্বানকে বিদেশি হস্তক্ষেপের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন। তাঁরা বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করছেন। তাঁদের দাবি, চলমান বিক্ষোভ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নকশা করা ‘প্ল্যান বি’। ‘প্ল্যান এ’ ছিল গত বছরের মে মাসে ইসরায়েল ও ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধ।
‘বিরোধীদের বিরোধী’
বিক্ষোভের ফলে রাজপথে রেজা পাহলভির জনপ্রিয়তা নতুন করে বেড়েছে। তবে তিনি বিভক্ত বিরোধীদের মধ্যে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
ইরান বিশেষজ্ঞ আলিরেজা নাদার সম্প্রতি এক প্রবন্ধে লিখেছেন, পাহলভির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিরোধীদের বিভক্ত করছে। সমালোচকদের অভিযোগ, তার ঘনিষ্ঠরা অন্যান্য প্রভাবশালী বিরোধীদের আক্রমণ করছে। এসব প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নার্গিস মোহাম্মাদি অন্যতম। তারা তাকে ‘বামপন্থী’ বা ‘সন্ত্রাসী’ বলে আক্রমণ করছেন।
নাদার লিখেছেন, ‘অন্যদের অপছন্দ সত্ত্বেও পাহলভি তার পরামর্শকদের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।’
তাই এ ইরান বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘তিনি কি বিরোধীদের বিরোধী হয়ে উঠেছেন?’
বিক্ষোভের সমর্থকদের উল্টোভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে কি না, সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নাদারের মতে, পাহলভির অনলাইন সমর্থন আংশিকভাবে ইরানি সরকারের সঙ্গে যুক্ত সাইবার বাহিনীর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই সমর্থকগোষ্ঠী বিভেদ সৃষ্টি করতে কাজ করছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, আসলে ‘কে কাকে প্রভাবিত করছে?’
বিরোধীদের মধ্যে এসব অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ থাকলেও রেজা পাহলভিই এখন পর্যন্ত বিরোধীদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত মুখ।
যদিও এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আছে, তবু পাহলভি বর্তমান অস্থিরতার সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ। ট্রাম্প প্রশাসনও কাউকে সরাসরি সমর্থন দিচ্ছেন না।
আগুনে পুড়ছে তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন শহর। এমন পরিস্থিতিতে ৪৭ বছর ধরে সিংহাসনের বাইরে থেকে থাকা নির্বাসিত এই ‘রাজপুত্র’ শেষ পর্যন্ত কোন দান খেলেন, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
সূত্র: আল জাজিরা
এসি//