আন্তর্জাতিক

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হলে ‘সবচেয়ে নিরাপদ’ যেসব দেশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ধারাবাহিক বিমান হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্ভাব্য বৃহৎ যুদ্ধের শঙ্কা বাড়ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো বৈশ্বিক সংঘাতের আশঙ্কাকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে ইরান–এ সমন্বিত হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। দুই দেশ দাবি করেছে, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য প্রচেষ্টার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় সামরিক অভিযান চলছে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান, যা তেহরানের বর্তমান শাসন কাঠামোয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইলের হামলার পর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত–এর সামরিক স্থাপনাগুলোকে চিহ্নিত করা হয়। এই হামলাকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ–এর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বিষয়টি উল্লেখ করলেও তালিকায় ইরানের নাম আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

এদিকে ইরানের প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে দুই বাংলাদেশি প্রবাসী নিহত এবং আরও সাতজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে একজন হলেন আহমদ আলী ওরফে সালেহ আহমেদ (৫৫), যিনি আজমান–এ বসবাস করতেন এবং মৌলভীবাজারের বড়লেখা–এর বাসিন্দা ছিলেন। অন্য নিহত ব্যক্তি হলেন মো. তারেক, যিনি বাহরাইন–এ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারান।

মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে এই ঘটনা ঘটল ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর চতুর্থ বার্ষিকীর কয়েকদিন পর। বিশ্বজুড়ে যখন উত্তেজনা বাড়ছেই, তখন নতুন করে এই পরিস্থিতি উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। কয়েক দিন আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি প্রতিপক্ষ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ উসকে দেয়ার অভিযোগ তুলেছেন।

এমন অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে কোন দেশগুলো সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হতে পারে?

২০২৫ সালের গ্লোবাল পিস ইনডেক্সের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। বড় ধরনের বৈশ্বিক সংঘাত হলে সেসব দেশ তুলনামূলক নিরাপদ থাকতে পারে বলে মনে করা হয়। ‘বিশ্বব্যাপী শান্তির শীর্ষ পরিমাপক’ হিসেবে পরিচিত গ্লোবাল পিস ইনডেক্স তৈরি করে ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমি অ্যান্ড পিস নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান।

গ্লোবাল পিস ইনডেক্সে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ অন্তর্ভুক্ত। এটি ২৩টি গুণগত ও পরিমাণগত সূচকের ভিত্তিতে তৈরি, যেগুলো বিভিন্ন স্বীকৃত ও নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে নেওয়া। সূচকটি তিনটি মূল বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে শান্তির অবস্থা পরিমাপ করে। সেগুলো হলো দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষার মাত্রা, চলমান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের অবস্থা, এবং সামরিকীকরণের মাত্রা।

আইসল্যান্ড

সর্বশেষ ২০২৫ সালের গ্লোবাল পিস ইনডেক্সে আইসল্যান্ড প্রথম স্থানে রয়েছে। দেশটি তার ইতিহাসে কখনও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বা আগ্রাসনে জড়ায়নি। ভৌগোলিকভাবে দেশটি পৃথিবীর মূল ভূখণ্ড থেকে বেশ দূরবর্তী। ফলে এই দূরত্ব বড় ধরনের সংঘাতের সময় একটি বাড়তি সুবিধা হিসেবে দেখা হয়।

আইসল্যান্ডের নিজস্ব কোনো স্থায়ী সামরিক বাহিনী নেই। তবে তারা ন্যাটোর সদস্য। ফলে জোটের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় পড়ে দেশটি। এই ধারায় বলা হয়েছে, একটি সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ মানে সব সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ। কোনো কারণে দেশটি আক্রমণ করা মানে এই জোটের অন্য ৩১ সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। ফলে ন্যাটো-সংশ্লিষ্টতার দেশটির নিরাপত্তা সুবিধা হিসেবে ধরা হয়।

তাত্ত্বিকভাবে এটি আইসল্যান্ডের ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে ভাবমূর্তিকে কিছুটা প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। কারণ বড় সংঘাত হলে জোটগত বাধ্যবাধকতা সামনে আসতে পারে। তবে সামরিক শক্তি না থাকায় সম্ভাব্য যুদ্ধে দেশটি সরাসরি প্রধান লক্ষ্যবস্তু হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলক কম বলেই মনে করা হয়। যদিও জোটের যেকোনো সদস্য চাইলে ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ কার্যকর করার আহ্বান জানাতে পারে।

আয়ারল্যান্ড

গ্লোবাল পিস ইনডেক্স বা জিপিআই র‍্যাঙ্কিংয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আয়ারল্যান্ড। দেশটি সামরিক নিরপেক্ষতার নীতি বজায় রাখে। কিন্তু তাদের একটি ছোট প্রতিরক্ষা বাহিনী রয়েছে।

নিউজিল্যান্ড

সাম্প্রতিক সূচকে তৃতীয় স্থানে রয়েছে নিউজিল্যান্ড। দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত দেশটি বিশ্বের অন্যতম প্রত্যন্ত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। নিউজিল্যান্ডের নিজস্ব সামরিক বাহিনী রয়েছে। তবে দেশটি সাধারণভাবে খুবই নিরাপদ ও স্থিতিশীল হিসেবে বিবেচিত।

ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা বড় ধরনের বৈশ্বিক সংঘাতের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হতে পারে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে সংঘাত সম্ভবত অন্য অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত থাকবে ধারণা থেকেই একে সম্ভাব্য নিরাপদ আশ্রয় বলা হচ্ছে।

২০২৫ সালের গ্লোবাল পিস ইনডেক্সের শীর্ষ দশে আরও রয়েছে অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, পর্তুগাল, ডেনমার্ক, স্লোভেনিয়া এবং ফিনল্যান্ড। বিশেষ করে সুইজারল্যান্ড দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির জন্য পরিচিত।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #মধ্যপ্রাচ্য #তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ