দেশজুড়ে

দোল উৎসব উপলক্ষ্যে কুড়িগ্রামে ৩শ বছরের পুরনো মেলা অনুষ্ঠিত

কুড়িগ্রাম উত্তর প্রতিনিধি

দেশের উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির দোলের মেলাটি এ অঞ্চলের প্রাচীন ঐতিহ্য। ৩০০ বছরের পুরনো এ মেলায় বৃহত্তর রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে ভক্তরা এ মেলায় অংশ গ্রহন করেন।

বুধবার (৪ মার্চ) সকাল ৯ টা থেকে শুরু হওয়া মেলা শেষ হয় আজ ৫ মার্চ বিকেলে।

মেলা স্থানে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রতি বছরের মতো এ বছরও ৪৬ টি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দোল মূর্তি নিয়ে আসা হয়।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ছোট দোল মূর্তি চার জন ও বড়গুলো ৮-১০ জন ভক্ত কাঁধে নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা মেলা প্রাঙ্গণে ঢাক-ঢোলের বাজনায় পৌরণিক নৃত্যের তালে তালে ঘুরে বেড়ান। এ সময় উপস্থিত ভক্তরা পরিবারসহ ভক্তিময় চিত্তে নিজেদেরকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে সমর্পণ করে এ মেলা রাত সাড়ে ১২ টা পর্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে উপভোগ করে।

মেলা কমিটি জানায়, বাংলা ১৩০৪ সনে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর জমিদারের বংশধর সব কিছু ছেড়ে চলে যান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য কোচবিহার জেলায়। বর্তমানে তারা কোচবিহার জেলা শহরে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছেন।

নাওডাঙ্গার জমিদারবাড়ির ঐতিহ্যবাহী জাঁকজমকপূর্ণ দোল উৎসবটি ধরে রাখার জন্য প্রতি বছর বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালন করে আসছেন স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন।

পূঁজারী বীরেন্দ্র নাথ বর্ম্মন জানান, তিন দিন ব্যাপী দোল উৎসবটি সোমবার (২ মার্চ) রাতে ন্যাড়া (ঘর) পোড়ানোর মধ্য দিয়ে দোলযাত্রার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

এই পূজারী আরও জানান, দোলযাত্রা হিন্দু বৈষ্ণবদের উৎসব। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, এ দিন শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে রাধিকা এবং তার সখীদের সঙ্গে আবির খেলেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি। এ কারণে দোলযাত্রার দিন এ মতের বিশ্বাসীরা রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ আবিরে রাঙিয়ে দোলায় চড়িয়ে নগর কীর্তনে বের হন।

বুধবার সকালে পূজা শেষে  দুপুর ১ টার দিকে বিভিন্ন এলাকায় যাদের বাড়িতে দোল মূর্তি নেই, সেই সকল বাড়িতে নিমন্ত্রণ পালন করতে সওয়ারীরা বাহারি সাজে সজ্জিত হয়ে দোল মূর্তি সিংহাসনে কাঁধে নিয়ে যান। সেখানে বাড়ির লোকজন দোল ঠাকুরের পূজা অর্চনা ও বরণ করে এবং পায়ে আবির দিয়ে পরিবার ও জগতের মঙ্গল কামনা করে।

পরে নিমন্ত্রণ শেষে সন্ধ্যা হওয়ার পর পর নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ির দোল মেলায় অংশ নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত আনন্দমুখর পরিবেশে দোল উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

চট্টগ্রাম থেকে আসা  শিক্ষিকা বৃষ্টি চৌধুরী জানান, বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে সবচেয়ে দোল উৎসবের বিষয়টি পত্র-পত্রিকায় দেখেছি। অনেক দিনের ইচ্ছা একদিন দেশের উত্তরের সীমান্তঘেষা কুড়িগ্রাম জেলার নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির দোল মেলায় যাবো। মুলত সেই ইচ্ছা ২০২৬ সালের এসে পুরণ হলো। আমি আমার এক ছোট ভাইকে নিয়ে মেলায় এসেছি। এখানে দোল উৎসবটি  জাঁকজঁমকপূর্ণ ভাবেই হয়েছে। সত্যিই খুবই ভালো লেগেছে। আবার কখনো সুযোগ পেলে দোল মেলায় আসব

রাজারহাট উপজেলা থেকে আসা অভিজিৎ চন্দ্র জানা, নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়িপ্রাঙ্গণের দোল উৎসবটি অনেক পুরনো ঐতিহ্য। শৈশবকাল থেকে এখানকার দোল উৎসব আসা হয়। মেলায় এসে সত্যি মনের প্রশান্তি ফিরে পাই।

দোলের মেলা উদযাপন কমিটির সভাপতি শুশীল কুমার রায় ও সাধারণ সম্পাদক রতন চন্দ্র রায় জানান, প্রায় ৩শ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক দোল উৎসবে দর্শনার্থীদের স্বত: স্ফুর্ত অংশগ্রহণ ও প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও ঐতিহ্যবাহী দোলের মেলা অত্যান্ত  শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়েছে।

এখন জমিদার নেই কিন্তু জমিদারবাড়ি রয়েছে। জমিদারবাড়ি প্রাঙ্গণে দোলউৎসবের আয়োজন করা হয়। মেলাটি রাত ১২ টায় মেলায় অংশ নেয়া দোল মূর্তি গুলোকে বিদায় জানানো হয়েছে। মেলায় শতশত দোকানর বেচা বিক্রি চলে রাত দেড়টা পযর্ন্ত। বৃহস্পতিবার বাসি মেলা চলে বিকাল সাড়ে ৫ টা পর্যন্ত।

ফুলবাড়ী থানার এ এস আই আব্দুল মালেক জানান, নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ির ঐতিহ্যবাহী মন্দির প্রাঙ্গণে দোল উৎসবে দূর-দূরান্ত থেকে আসা হাজারো দর্শনার্থী শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দোল উৎসব উপভোগ করেছে। মেলা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুলিশ, গ্রাম পুলিশ ও মেলা কমিটির লোকজন সক্রিয় ভুমিকা রেখেছে। ফলে প্রতি বছরের ন্যায় এ বছর ঐতিহ্যবাহী দোল উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

 

আই/এ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #কুড়িগ্রাম