হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মহান আত্মত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের স্মৃতিস্মরণে বিশ্বজুড়ে যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় প্রতি বছর উদযাপিত হয় পবিত্র ঈদুল আজহা। এদিন মুসলিম উম্মাহ ইব্রাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগের স্মরণে পশু কোরবানি করে থাকে।
ইসলামের বিধান অনুযায়ী, নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে যদি কোরবানি করা হলে তা আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না।
কোরবানি কবুল হওয়ার শর্ত-
নিয়তের বিশুদ্ধতা (একনিষ্ঠতা)
কোরবানি কবুলের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো বিশুদ্ধ নিয়ত। লোক দেখানো, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি বা কেবল গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে কোরবানি করলে কোরবানি কবুল হবে না। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কোরবানি করতে হবে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।" (সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৩৭)
হালাল উপার্জন
কোরবানির পশুটি যে টাকা দিয়ে কেনা হচ্ছে, সেই অর্থ সম্পূর্ণ হালাল হতে হবে। সুদ, ঘুষ, আত্মসাৎ বা যেকোনো হারাম উপায়ে অর্জিত টাকা দিয়ে কোরবানি করলে তা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হবে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "হে মানুষ! নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা পবিত্র, তিনি পবিত্র (হালাল) বস্তু ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১০১৫)
শরিয়ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট ও সুস্থ পশু
কোরবানির পশু হতে হবে গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু। চতুষ্পদ জন্তুর অন্তর্ভুক্ত হলো উট, গরু, মহিষ, বকরি, ভেড়া ও দুম্বা। এগুলো ব্যতীত অন্য কোনো প্রকার পশু দ্বারা কুরবানি হবে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "চার ধরনের পশু দিয়ে কোরবানি করা জায়েজ নয়- স্পষ্ট অন্ধ, স্পষ্ট অসুস্থ, স্পষ্ট ল্যাংড়া (যা ভালো করে হাঁটতে পারে না) এবং এমন জীর্ণ-শীর্ণ পশু যার হাড্ডিতে কোনো মজ্জা নেই।" (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং: ১৪৯৭)
কোরবানির পশুর বয়সের ক্ষেত্রেও ইসলামী শরীয়তে দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে উট কমপক্ষে ৫ বছর, গরু বা মহিষ কমপক্ষে ২ বছর, এবং ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা কমপক্ষে ১ বছর বয়সের হতে হবে। (তবে ভেড়া বা দুম্বা যদি ৬ মাসেরও হয় কিন্তু দেখতে ১ বছর বয়সের মতো পুষ্ট লাগে, তাহলে তা দিয়ে কোরবানি জায়েজ)।
সুন্নাহ বা সঠিক নিয়মে জবেহ করা
কোরবানি সম্পন্ন করার প্রক্রিয়াটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো পদ্ধতি অনুযায়ী হতে হবে। জবেহ করার সময় "বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার" বলতে হবে।
আল্লাহ বলেন, "যেসব পশুর ওপর আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি, তোমরা সেগুলো থেকে আহার করো না; নিশ্চয়ই তা গুনাহের কাজ।" (সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১২১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে দয়া ও উত্তম আচরণ ফরজ করেছেন... অতএব যখন তোমরা জবেহ করবে, তখন উত্তম পদ্ধতিতে জবেহ করো। তোমাদের প্রত্যেকে যেন তার ছুরি ধারালো করে নেয় এবং তার জবেহকৃত পশুকে শান্তি দেয়।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৯৫৫)
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবেহ করা
কোরবানি একটি নির্দিষ্ট সময়ের ইবাদত। জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ঈদের নামাজ শেষ হওয়ার পর থেকে জিলহজ মাসের ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত কোরবানির সময় থাকে। একই সাথে পবিত্র কোরআনে পশু কাটার ছুরি খুব ভালোভাবে ধারালো করে নেওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আজকের দিনে আমাদের প্রথম কাজ হলো ঈদের সালাত আদায় করা, এরপর ফিরে গিয়ে কোরবানি করা। যে ব্যক্তি এভাবে করবে, সে আমাদের সুন্নত অনুসরণ করল। আর যে ব্যক্তি সালাতের আগেই জবেহ করল, তা কেবলই গোশত, যা সে নিজের পরিবারের জন্য অগ্রিম ব্যবস্থা করল; এর সাথে কোরবানির কোনো সম্পর্ক নেই।"(সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৯৬৫)
আরআই/এমএ//