হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মহান আত্মত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের স্মৃতিস্মরণে বিশ্বজুড়ে যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় প্রতি বছর উদযাপিত হয় পবিত্র ঈদুল আজহা। এদিন মুসলিম উম্মাহ ইব্রাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগের স্মরণে পশু কোরবানি করে।এই দিনে মহান আল্লাহ ও আমাদের প্রিয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং কিছু কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন।
ঈদুল আজহায় করণীয় কাজসমূহ বর্ণনা করা হলোঃ
১. গোসল করা ও সুগন্ধি ব্যবহার করা
ঈদের নামাজের আগে উত্তমরূপে গোসল করা, পবিত্র পোশাক পরিধান করা এবং সুগন্ধি (আতর) ব্যবহার করা সুন্নাত।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ঈদের দিনে ঈদগাহে যাওয়ার আগে গোসল করতেন। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস: ৪২৮)
২. কিছু না খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া
ঈদুল ফিতরে কিছু খেয়ে ঈদগাহে যাওয়ার নিয়ম থাকলেও, ঈদুল আজহায় আল্লাহর রাসুল (সা.) না খেয়ে ঈদগাহে যেতেন এবং কোরবানির গোশত দিয়ে প্রথম খাবার গ্রহণ করতেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল আজহার দিনে না খেয়ে বের হতেন, অত:পর নামাজ আদায় করে ফিরে এসে নিজের কোরবানির গোশত খেতেন। (তিরমিজি, হাদিস: ৫৪২; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৭৫৬)
৩.তাকবির পাঠ করা
৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর উচ্চস্বরে (নারীরা মনে মনে) তাকবিরে তাশরিক পড়া ওয়াজিব। এছাড়া ঈদের দিন সকাল থেকে ঈদগাহে যাওয়া পর্যন্ত বেশি বেশি তাকবির পড়া সুন্নাত।
আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
৪. পায়ে হেঁটে এবং পথ পরিবর্তন করে ঈদগাহে যাওয়া
সম্ভব হলে ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া এবং যাওয়ার সময় যে পথ ব্যবহার করা হয়েছে, ফেরার সময় অন্য পথ ব্যবহার করা সুন্নাত।
নবী করিম (সা.) ঈদের দিনে পথ পরিবর্তন করতেন (এক পথে গিয়ে অন্য পথে ফিরতেন)। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৮৬)
৫. ঈদের নামাজ আদায় করা
ঈদের নামাজ আদায় করা ওয়াজিব। জিলহজের ১০ তারিখ সকালে সূর্য ওঠার পর একটু দ্রুত ঈদের নামাজ আদায় করা উত্তম, যেন দ্রুত কোরবানি সম্পন্ন করা যায়।
"সুতরাং আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কোরবানি করুন।" (সূরা কাউসার, আয়াত: ২)
৬. নিজের কোরবানি নিজে করা এবং দোয়া পড়া
নিজের কোরবানির পশু নিজে জবেহ করা উত্তম। জবেহ করার সময় নির্দিষ্ট দোয়া ও তাসমিয়া (বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার) পড়া আবশ্যক।
নবী (সা.) দুটি শিংওয়ালা চিতি রঙের দুম্বা নিজের হাতে জবেহ করেছেন এবং জবেহ করার সময় বিসমিল্লাহ ও তাকবির বলেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৬৫)
৭. কোরবানির গোশত বণ্টন করা
কোরবানির গোশত নিজে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের উপহার দেওয়া এবং দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা সুন্নাত। সাধারণত গোশত তিন ভাগে বণ্টন করা মুস্তাহাব।
"অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার করো এবং দুস্থ, অভাবগ্রস্তকে আহার করাও।" (সূরা হজ, আয়াত: ২৮)
ঈদুল আজহায় বর্জনীয় কাজসমূহঃ
১. ঈদের দিন রোজা রাখা
রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৯২; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮২৭)
২. ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করা
ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করলে তা সাধারণ জবাই হিসেবে গণ্য হবে, কোরবানি হবে না।
রেফারেন্স: নবী (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে জবেহ করলো, সে নিজের জন্যই জবেহ করলো। আর যে নামাজের পর জবেহ করলো, তার কোরবানি পূর্ণ হলো এবং সে মুসলিমদের আদর্শ অনুসরণ করলো।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৪৬)
৩. পশুর চামড়া বা গোশত দিয়ে কসাইয়ের মজুরি দেওয়া
কোরবানির পশুর কোনো অংশ (গোশত, চামড়া, চর্বি ইত্যাদি) কসাই বা পারিশ্রমিক হিসেবে কাউকে দেওয়া জায়েজ নেই। কসাইয়ের মজুরি নিজের পকেট থেকে আলাদাভাবে দিতে হবে।
হযরত আলী (রা.) বলেন, "রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন... আমি যেন কোরবানির কোনো কিছু কসাইকে তার মজুরি বাবদ না দিই। আমরা তাকে নিজের পক্ষ থেকে (মজুরি) দিতাম।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩১৭)
৪. পশুর সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করা
জবেহ করার সময় পশুকে কষ্ট দেওয়া, এক পশুর সামনে অন্য পশু জবেহ করা বা ভোঁতা ছুরি ব্যবহার করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
"নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়ে দয়া ও উত্তম আচরণ ফরজ করেছেন... সুতরাং তোমরা যখন জবেহ করবে, উত্তম পদ্ধতিতে জবেহ করো। তোমাদের সবার উচিত ছুরিতে শান দেওয়া এবং জবেহকৃত পশুকে শান্ত করা।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৫৫)
৫. কোরবানির পশুর কোনো অংশ বিক্রি করা
কোরবানির পশুর গোশত, চামড়া বা হাড় বিক্রি করা যাবে না। চামড়া বিক্রি করলে তার পুরো টাকা গরিব-মিসকিনদের দান করে দিতে হবে, নিজে ভোগ করা যাবে না।
"যে ব্যক্তি কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করে দিল, তার কোরবানি (পূর্ণাঙ্গ) হলো না।" (মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস: ৩৪৬৮; বায়হাকি, ৫/২৩৯)
৬. রক্ত ও বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে পরিবেশ নষ্ট করা
কোরবানির পর পশুর রক্ত, মলমূত্র ও অপ্রয়োজনীয় অংশ রাস্তাঘাটে ফেলে রাখা যাবে না। কারণ ইসলামে অন্যকে কষ্ট দেওয়া বা পরিবেশ নোংরা করা নিষিদ্ধ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস:২২৩)।
আর/আই