লাইফস্টাইল

বসের সাথে দ্বিমত প্রকাশের স্মার্ট কৌশল

লাইফস্টাইল ডেস্ক

করপোরেট দুনিয়ায় একটি প্রচলিত কৌতুক আছে—‘রুল নাম্বার ওয়ান: বস ইজ অলওয়েজ রাইট। রুল নাম্বার টু: বস যদি কখনো ভুল করেন, তবে রুল নাম্বার ওয়ান দেখুন!’

বাস্তবতা হলো, বসও মানুষ এবং মানুষের ভুল হওয়া বা কোনো বিষয়ে ভিন্নমত থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নিজের ক্যারিয়ারের ক্ষতি না করে বসের আইডিয়ার সাথে দ্বিমত পোষণ করাটা একটা দারুণ শিল্প। সঠিক উপায়ে বলতে না পারলে আপনার ভালো যুক্তিটিও বসের কাছে ‘অহংকার’ বা ‘অবাধ্যতা’ মনে হতে পারে।

তাহলে কীভাবে নিজের মতামতকে অপমানজনক না করে, পেশাদারত্বের সাথে সিনিয়রদের সামনে তুলে ধরবেন? চলুন জেনে নেওয়া যাক কিছু স্মার্ট কৌশল-

‘আপনি ভুল’—সরাসরি এই শব্দগুলো এড়িয়ে চলুন

কোনো মিটিং বা আলোচনায় বসের কোনো আইডিয়া পছন্দ না হলে শুরুতেই ‘না, এটা হবে না’ বা ‘আপনি ভুল বলছেন’—এ জাতীয় নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করবেন না। এতে অপরপক্ষ শুরুতেই রক্ষণাত্মক (Defensive) হয়ে পড়ে।

কৌশল: বসের বক্তব্যের ভালো দিকটার প্রশংসা দিয়ে শুরু করুন। যেমন: "আপনার আইডিয়াটা বেশ দারুণ এবং এর লক্ষ্যটা চমৎকার। তবে আমার মাথায় একটা ছোট প্রশ্ন বা বিকল্প ভাবনা আসছিল, যদি অনুমতি দেন তবে শেয়ার করতে পারি।"

আবেগের বদলে কথা বলুক ‘উপাত্ত ও যুক্তি’

"আমার মনে হয় আপনার আইডিয়াটা কাজ করবে না"—এমন মনগড়া মন্তব্যের কোনো করপোরেট মূল্য নেই। বসের সিদ্ধান্তের বিপরীতে যখনই কিছু বলবেন, আপনার ঝুলিতে যেন পর্যাপ্ত তথ্য, উপাত্ত (Data) বা লজিক থাকে।

কৌশল: বসের পরিকল্পনার কোনো দুর্বলতা ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সেটির একটি বাস্তবসম্মত সমাধানও সাথে রাখুন। করপোরেট ট্রেইনারদের মতে, "সমস্যা নিয়ে বসের কাছে যাবেন না, সমস্যার সমাধান নিয়ে যান।"

সঠিক সময় ও স্থান নির্বাচন করুন

দশজন সহকর্মী বা ক্লায়েন্টের সামনে বসের কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এতে বসের অহংবোধে (Ego) আঘাত লাগতে পারে, যা আপনার ক্যারিয়ারের জন্য ভালো ফল আনবে না।

কৌশল: যদি দ্বিমতটা বড় কোনো বিষয়ের হয়, তবে মিটিংয়ের পর বসের কেবিনে গিয়ে আলাদাভাবে কথা বলুন। ওয়ান-টু-ওয়ান আলোচনায় মানুষ অনেক বেশি খোলামনে অন্যের যুক্তি শোনে।

পরিস্থিতি সামলানোর একটি বাস্তব উদাহরণ

বিষয়টি বুঝতে একটি বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক। একটি বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত জুনিয়র অ্যানালিস্ট রাশেদের (ছদ্মনাম) কথাই ধরা যাক। একবার তার টিম লিডার একটি নতুন প্রজেক্টে এক লাফে ৫০% বাজেট বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন। কিন্তু রাশেদের বাজার বিশ্লেষণ বলছিল, এই বিনিয়োগে কোম্পানির বড় আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।

জনসম্মুখে বা সবার সামনে টেবিল চাপড়ে বসের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা না করে রাশেদ একটি পেশাদার পথ বেছে নেয়। সে অপেক্ষা করে সঠিক মুহূর্তের। লাঞ্চের পর সে বসের সাথে ওয়ান-টু-ওয়ান মিটিংয়ের সুযোগ তৈরি করে এবং বসের পরিকল্পনার প্রশংসা করে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে নিজের তৈরি ৩ মাসের একটি ডেটা শিট সামনে রাখে।

রাশেদ বলে, "স্যার, আপনার প্ল্যানটি ধরে রেখেই যদি আমরা বাজেট কিছুটা রি-অ্যালোকেট করি, তবে আমাদের প্রফিট মার্জিন আরও ২০% বাড়ানো সম্ভব।"

সে কোনো অভিযোগ বা ভুল ধরেনি, সে কেবল একটি মোক্ষম সমাধান দেখিয়েছে। এই পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গির পুরস্কার হিসেবে পরের মাসেই তার ডেস্কে চলে আসে পদোন্নতির চিঠি।

বিশ্বখ্যাত সাংগঠনিক মনোবিজ্ঞানী এবং বেস্টসেলার বই ‘থিংক এগেইন’ (Think Again)-এর লেখক অ্যাডাম গ্র্যান্ট (Adam Grant)-এর মতে, "অফিসে বসের সাথে দ্বিমত পোষণ করাটা নেতিবাচক কিছু নয়, বরং এটি আপনার সৃজনশীলতা ও কাজের প্রতি নিষ্ঠা প্রমাণ করে। তবে মূল চাবিকাঠি হলো আপনার 'টোন' বা কণ্ঠস্বর এবং বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। আপনি যখন কথা বলছেন, তখন আপনার বসার ভঙ্গি বা গলার আওয়াজ যেন আক্রমণাত্মক না হয়ে বিনয়ী কিন্তু আত্মবিশ্বাসী হয়। বসকে কখনো প্রতিপক্ষ ভাববেন না; তাকে বোঝান যে আপনারা দুজনেই আসলে কোম্পানির ভালোর জন্যই কাজ করছেন।"

কর্মক্ষেত্রে ‘ইয়েস স্যার’ বা ‘জি হুজুর’ টাইপ কর্মী হওয়ার চেয়ে নিজের একটি নিজস্ব ও যৌক্তিক মতামত থাকা অনেক বেশি সম্মানের। তবে সেই ভিন্নমত প্রকাশের পদ্ধতিটি যেন বিনম্র ও পেশাদার হয়। মনে রাখবেন, সঠিক উপায়ে দ্বিমত পোষণ করাটা বসের অবাধ্যতা নয়, বরং দক্ষতার লক্ষণ!

 

সূত্র: বিবিসি

এসি//

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #করপোরেট দুনি #বস