যে প্রাঙ্গণে দীর্ঘ জীবনে শিল্প, সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতির আলো ছড়িয়েছেন, শেষ বিদায়েও সেই প্রিয় কর্মস্থলেই ফিরে এলেন বাংলাদেশের চিত্রকলা, টেলিভিশন ও পাপেট আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ‘পাপেটম্যান’ খ্যাত মুস্তাফা মনোয়ার।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় তার প্রথম জানাজা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষার্থী এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা।
সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ বিটিভি প্রাঙ্গণে পৌঁছালে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান উপস্থিত সবাই। পরে সকাল ৯টা ৫২ মিনিটে অনুষ্ঠিত হয় তার প্রথম জানাজার নামাজ।

জানাজায় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলম, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ, নাট্যব্যক্তিত্ব ম হামিদসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা অংশ নেন।
জানাজা শেষে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন নাট্যব্যক্তিত্ব ম হামিদ।
তিনি বলেন, মুস্তাফা মনোয়ার শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন টেলিভিশন ও সংস্কৃতি অঙ্গনের অসংখ্য মানুষের শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং অনুপ্রেরণা।
নিজের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে ম হামিদ জানান, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেওয়ার সুযোগ থাকলেও মুস্তাফা মনোয়ারের পরামর্শেই তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে কাজ শুরু করেন। তার সেই পরামর্শই জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলম বলেন, মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উজ্জ্বল নক্ষত্র। দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে তার অবদান নেই। বিটিভি থেকে শুরু করে শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তার নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতা অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, দেশের শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান ব্যক্তিদের তালিকায় মুস্তাফা মনোয়ারের নাম সবসময় সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হবে। কৈশোর থেকেই মানুষ তার সৃষ্টিশীল কাজের সঙ্গে পরিচিত। তিনি যে দায়িত্বই পালন করেছেন, সেখানেই রেখে গেছেন মেধা ও সৃজনশীলতার স্বাক্ষর।

বিটিভিতে শ্রদ্ধা নিবেদন ও প্রথম জানাজা শেষে মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয় তার মরদেহ।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্যজন, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান এই কিংবদন্তি শিল্পীকে। পরে দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
এরপর মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে, যেখানে অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় জানাজা। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ও চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে মুস্তাফা মনোয়ারকে।
শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা বলেন, মুস্তাফা মনোয়ারের চলে যাওয়া শুধু একজন গুণী মানুষের বিদায় নয়, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি।
এসি//