বিশ্বকাপের ম্যাচে একটি বিষয় প্রায়ই চোখে পড়ে—এক দল তাদের ঐতিহ্যবাহী জার্সিতে খেললেও, অন্য ম্যাচে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন রঙের পোশাকে মাঠে নামছে। কখনো আবার একই জার্সির সঙ্গে বদলে যায় শর্টস কিংবা মোজার রঙও। অনেকের কাছে এটি নিছক নান্দনিকতা বা বাণিজ্যিক কৌশল মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বিশ্বকাপে কোন দল কোন জার্সি পরবে, সেটি নির্ধারিত হয় ফিফার কঠোর, বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর নীতিমালার মাধ্যমে।
ফিফার কাছে জার্সি কেবল একটি পোশাক নয়; এটি খেলার স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা, সম্প্রচারমান, দর্শকের অভিজ্ঞতা এবং খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
ম্যাচের জার্সি ঠিক করে কে?
বিশ্বকাপে কোন দল কোন জার্সি পরে খেলবে, সেই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে ফিফার। টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগেই প্রতিটি অংশগ্রহণকারী দেশ তাদের হোম ও অ্যাওয়ে কিটের নকশা, রঙ, নম্বর, নামের ফন্টসহ বিস্তারিত তথ্য ফিফার কাছে জমা দেয়।
এরপর বিশেষ একটি কালার কনট্রাস্ট ম্যাট্রিক্স ব্যবহার করে সম্ভাব্য প্রতিটি ম্যাচের জন্য দুই দলের জার্সির রঙ বিশ্লেষণ করা হয়। ফিফার লক্ষ্য একটাই—মাঠে যেন কোনো পরিস্থিতিতেই দুই দলকে আলাদা করতে বিভ্রান্তি না তৈরি হয়।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, সূচিতে প্রথমে থাকা বা 'হোম' দল তাদের মূল জার্সি পরার অগ্রাধিকার পায়। তবে যদি প্রতিপক্ষের জার্সির সঙ্গে রঙের মিল থাকে, তাহলে 'অ্যাওয়ে' দলকে বিকল্প জার্সি পরতে হয়। প্রয়োজন হলে হোম দলকেও বিকল্প কিট ব্যবহারের নির্দেশ দিতে পারে ফিফা।

শুধু শার্ট নয়, শর্টস ও মোজাও বদলাতে হতে পারে
অনেকেই মনে করেন, শুধু জার্সির রঙ আলাদা হলেই যথেষ্ট। কিন্তু ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া ফিফা ইকুইপমেন্ট রেগুলেশনস ২০২৫-এ নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে।
নতুন বিধির ৬.২.১ ধারায় বলা হয়েছে, শুধু শার্ট নয়—শার্ট, শর্টস এবং মোজা—এই তিনটি অংশই প্রতিপক্ষের একই অংশের সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য সৃষ্টি করতে হবে।
ধরা যাক, একটি দলের পোশাক লাল শার্ট, সাদা শর্টস এবং লাল মোজা। সে ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ শুধু শার্টের রঙ পাল্টালেই চলবে না; শর্টস ও মোজার রঙও এমন হতে হবে, যাতে দুই দলকে সহজে আলাদা করা যায়।
এ কারণেই বিশ্বকাপে মাঝেমধ্যে দেখা যায়, একটি দল হোম জার্সির সঙ্গে অ্যাওয়ে কিটের শর্টস বা মোজা পরে খেলছে। এটি কোনো ফ্যাশন নয়; ফিফার বাধ্যতামূলক নির্দেশনা।

খালি চোখ নয়, বিজ্ঞানের পরীক্ষায় পাস করতে হয় জার্সিকে
জার্সির রঙ গাঢ় না হালকা—এটি ফিফা শুধু চোখে দেখে নির্ধারণ করে না। এ জন্য ব্যবহার করা হয় স্পেক্ট্রোফোটোমেট্রিক মেজারমেন্ট নামের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।
এই পরীক্ষায় ডেল্টা এল স্কেল ব্যবহার করে কাপড়ের আলোর প্রতিফলন, উজ্জ্বলতা এবং রঙের তীব্রতা পরিমাপ করা হয়।
বিশেষভাবে পরীক্ষা করা হয় জার্সির পেছনে থাকা খেলোয়াড়ের নাম ও নম্বর। কারণ তীব্র আলো, ছায়া কিংবা দূর থেকে টেলিভিশনে দেখার সময়ও নম্বর যেন পরিষ্কারভাবে পড়া যায়।
টেলিভিশনের কোটি দর্শকের কথাও ভাবতে হয়
বিশ্বকাপ এখন শুধু স্টেডিয়ামের খেলা নয়; এটি কোটি কোটি মানুষের টেলিভিশন ও ডিজিটাল পর্দার আয়োজন।
তাই ফিফা জার্সি নির্বাচন করার সময় রেফারি কিংবা খেলোয়াড়দের পাশাপাশি সম্প্রচারমানও বিবেচনায় রাখে।
বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় বর্ণান্ধ দর্শকদের। বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় লাল-সবুজ বর্ণান্ধতা। সে কারণে ফিফা এমন পরিস্থিতি এড়াতে চায়, যেখানে একটি দল পুরো লাল এবং অন্য দল পুরো সবুজ জার্সি পরে মাঠে নামে।
ম্যাচ শুরুর আগে প্রতিটি সম্ভাব্য কিট কম্বিনেশন ডিজিটাল কালার ফিল্টার ব্যবহার করে পরীক্ষা করা হয়। এমনকি সাদা-কালো স্ক্রিনেও যদি দুই দলকে আলাদা করা কঠিন হয়, তাহলে জার্সি পরিবর্তন বাধ্যতামূলক করা হয়।
গোলরক্ষকদের জন্য আরও কঠোর নিয়ম
গোলরক্ষকদের ক্ষেত্রে নিয়ম আরও কড়া। তাদের জার্সি শুধু প্রতিপক্ষ নয়, নিজেদের দলের খেলোয়াড় এবং ম্যাচ কর্মকর্তাদের পোশাক থেকেও সম্পূর্ণ আলাদা হতে হবে।

এ কারণে প্রতিটি দলের গোলরক্ষকদের জন্য সাধারণত তিন থেকে চারটি ভিন্ন রঙের কিট রাখা হয়।
ফিফার নতুন নির্দেশনায় অন্তত তিন ধরনের রঙের বিকল্প রাখতে হয়—
- একটি উজ্জ্বল রঙ, যেমন নিয়ন সবুজ বা হলুদ।
- একটি গাঢ় রঙ, যেমন কালো বা নেভি নীল।
- একটি হালকা রঙ, যেমন ধূসর বা আকাশি।
এর ফলে মাঠে যেকোনো পরিস্থিতিতে গোলরক্ষকের জন্য উপযুক্ত কনট্রাস্ট নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
জার্সি শুধু পোশাক নয়, একটি পরিচয়
বিশ্বকাপের জার্সি এখন একটি দেশের পরিচয়েরও প্রতীক।
স্পোর্টস ব্র্যান্ডগুলো প্রতিটি দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে জার্সির নকশায় তুলে ধরার চেষ্টা করে।

ব্রাজিলের জার্সিতে জাগুয়ারের নকশা কিংবা জাপানের জার্সিতে ঐতিহ্যবাহী ওরিগামি শিল্পের ছোঁয়া তারই উদাহরণ।
অনেক দেশের জার্সির রঙ আবার জাতীয় পতাকার সঙ্গে মেলে না।
ইতালির পতাকায় নীল নেই, তবু দেশটি নীল জার্সি পরে। কারণ এটি তাদের সাবেক রাজপরিবার 'হাউস অব সাভয়'-এর ঐতিহ্যের প্রতীক।
একইভাবে নেদারল্যান্ডস কমলা জার্সি পরে রাজপরিবার 'হাউস অব অরেঞ্জ'-এর প্রতি সম্মান জানিয়ে।
জার্সিতে বার্তা থাকে, কিন্তু সীমা টেনে দেয় ফিফা
আধুনিক ফুটবলে জার্সি শুধু খেলার পোশাক নয়, এটি বিভিন্ন সামাজিক বার্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই প্রতিটি বিশ্বকাপে জার্সির হাতায় বিশেষ প্রচারণামূলক ব্যাজ যুক্ত করে ফিফা। অতীতের আসরগুলোতে বর্ণবাদবিরোধী (#NoDiscrimination), জলবায়ু সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যসচেতনতাসংক্রান্ত বিভিন্ন বার্তা বহনকারী ব্যাজ দেখা গেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপেও জার্সির বাম হাতায় থাকবে ফিফার বিশেষ ‘সামাজিক প্রভাব প্রচারণার ব্যাজ’।
তবে এ ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের জন্য কঠোর বিধিনিষেধও রয়েছে। ফিফার কিট বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড়ই নিজের জার্সিতে বা জার্সির নিচে পরা পোশাকে ব্যক্তিগত, ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক কোনো স্লোগান বা বার্তা প্রদর্শন করতে পারবেন না।
ব্যবসারও বড় বাজার
জার্সির আরেকটি বড় দিক হলো বাণিজ্য।
হোম, অ্যাওয়ে কিংবা বিশেষ সংস্করণের জার্সি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সমর্থক কিনে থাকেন। এই বিক্রি থেকে জাতীয় ফুটবল ফেডারেশন ও স্পোর্টস ব্র্যান্ডগুলোর উল্লেখযোগ্য আয় হয়।
তবে বিশ্বকাপে ক্লাব ফুটবলের মতো নিয়মিত 'থার্ড কিট' ব্যবহার করা হয় না। সাধারণত দুটি কিট এবং প্রয়োজনে শর্টস-মোজার সমন্বয় বদল করেই সব ম্যাচ খেলা হয়।

আলোও নির্ধারণ করে জার্সির সৌন্দর্য
জার্সির রঙ সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে স্টেডিয়ামের আলোর ওপরও কঠোর নিয়ম আরোপ করেছে ফিফা।
বিশ্বকাপের ভেন্যুগুলোতে স্ট্যান্ডার্ড এ লাইটিং বাধ্যতামূলক।
এতে নির্দিষ্ট মাত্রার উল্লম্ব ও অনুভূমিক আলোকসজ্জা নিশ্চিত করা হয়, যাতে চার-কে ও আট-কে সম্প্রচার কিংবা সুপার স্লো-মোশন রিপ্লেতেও জার্সির রঙ, খেলোয়াড়ের নম্বর এবং অবস্থান নিখুঁতভাবে দেখা যায়।
রঙের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিজ্ঞান
বিশ্বকাপে একটি জার্সি কখনোই শুধু কাপড়ের টুকরো নয়। এর পেছনে কাজ করে রঙের বিজ্ঞান, আলোর হিসাব, প্রযুক্তির পরীক্ষা, সম্প্রচারের চাহিদা, খেলোয়াড়ের সুবিধা, দর্শকের অভিজ্ঞতা এবং একটি দেশের পরিচয়ের গল্প।
তাই পরেরবার যখন বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে দেখবেন একটি দল পরিচিত জার্সির বদলে ভিন্ন রঙের পোশাকে মাঠে নেমেছে, তখন বুঝবেন—এটি কোনো কাকতালীয় সিদ্ধান্ত নয়। এর পেছনে রয়েছে ফিফার সূক্ষ্ম পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং নিখুঁত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ।
এসি//