খেলাধুলা

বিশ্বকাপ ফাইনালে গুরু-শিষ্যের লড়াই

স্পোর্টস ডেস্ক

বিশ্বকাপ ফাইনাল মানেই শিরোপার লড়াই, ইতিহাস গড়ার লড়াই। তবে নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার এবারের ফাইনাল আরেকটি বিশেষ কারণে আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। মাঠের ডাগআউটে মুখোমুখি হচ্ছেন একসময়কার শিক্ষক ও ছাত্র—স্পেনের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি।

যে কোচের কাছ থেকে কৌশলগত ফুটবলের পাঠ নিয়েছিলেন স্কালোনি, এবার সেই শিক্ষকের বিপক্ষেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের পরিকল্পনা সাজাবেন তিনি।

ফাইনালের আগে সংবাদ সম্মেলনে দে লা ফুয়েন্তের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে আবেগ লুকাননি স্কালোনি।

তার মন্তব্য, ‘তার সম্পর্কে আমার দারুণ স্মৃতি রয়েছে। কোচিং কোর্সে তিনিই ছিলেন সেই মানুষ, যার সঙ্গে আমি সবচেয়ে বেশি কথা বলতাম। আমি সবসময় নানা প্রশ্ন করতাম, আর তিনি কখনো বিরক্ত হতেন না। আমার কাছে তিনি সব সময়ই অসাধারণ একজন মানুষ।’

দুই কোচের পরিচয়ের সূত্রপাত ২০১৭ সালে। সে সময় আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে হোর্হে সাম্পাওলির সহকারী হিসেবে কাজ করছিলেন স্কালোনি। একই সময়ে তিনি উয়েফা প্রো লাইসেন্স অর্জনের জন্য কোচিং কোর্সে অংশ নেন। সেই কোর্সে কৌশল ও খেলার ধরন বিষয়ে কোর্স  করাতেন দে লা ফুয়েন্তে, যিনি তখন স্পেনের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রয়্যাল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেও যুক্ত ছিলেন।

লাস রোজাসে অনুষ্ঠিত সেই কোর্সে স্কালোনির সঙ্গে আরও ছিলেন ফার্নান্দো রেদেন্দো, হাভিয়ের সাভিওলা, লিও ফ্রাঙ্কো ও হুলিও সেসারের মতো সাবেক তারকারা। তবে পরবর্তীতে কোচ হিসেবে সবচেয়ে বেশি সাফল্য এসেছে স্কালোনির ঝুলিতে। তার অধীনে আর্জেন্টিনা জিতেছে ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালের ফিনালিসিমা এবং একই বছরের বিশ্বকাপ।

প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক গিনেস মেলেন্দেস পরে স্মরণ করেছিলেন, স্কালোনি ছিলেন সবচেয়ে পরিশ্রমী শিক্ষার্থীদের একজন। তিনি নিয়মিত সামনের সারিতে বসতেন, মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করতেন এবং প্রতিটি বিষয় জানার আগ্রহ দেখাতেন।

দুই কোচের পথচলায়ও রয়েছে অদ্ভুত মিল। খুব বেশি অভিজ্ঞতা ছাড়াই দুজনই জাতীয় দলের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। দে লা ফুয়েন্তে ১৩ বছর আগে স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৯ দল দিয়ে জাতীয় দলের বয়সভিত্তিক কাঠামোয় কাজ শুরু করেন। পরে অনূর্ধ্ব-১৮, অনূর্ধ্ব-২১ এবং অলিম্পিক দলে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে লুইস এনরিকের বিদায়ের পর সিনিয়র দলের দায়িত্ব পান।

অন্যদিকে, সাম্পাওলির সহকারী হিসেবে কাজ করার পর মাত্র ছয়টি ম্যাচ অনূর্ধ্ব-২০ দলের দায়িত্ব পালন করেছিলেন স্কালোনি। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে আর্জেন্টিনার দায়িত্ব নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে স্থায়ী করে ফেলেন। তার নেতৃত্বেই দীর্ঘ শিরোপা-খরা কাটিয়ে কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্টিনা, এরপর ফিনালিসিমা এবং বিশ্বকাপও ঘরে তোলে লিওনেল মেসির দল।

বিশ্বকাপ জয়ের পর কাতারে দে লা ফুয়েন্তের সঙ্গে হওয়া একটি স্মৃতিও তুলে ধরেন স্কালোনি।

তিনি বলেন, ‘বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর একটি কোচ ফোরামের শেষে আমাদের দীর্ঘ সময় কথা হয়েছিল। কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলাম, যা আমার মনে হয় তার কাজে লেগেছে। আমি অহংকার করে বলছি না, ইতিবাচক অর্থেই বলছি। তিনি সেগুলো নিজের জাতীয় দলে দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন।’

শিষ্য সম্পর্কে উচ্চ ধারণার কথাও জানিয়েছেন দে লা ফুয়েন্তে।

তার মন্তব্য, ‘লিওনেল খুব পরিশ্রমী একজন ছাত্র ছিল। শেখার আগ্রহ, মনোভাব—সবকিছুই অসাধারণ ছিল। তার মধ্যে শুরু থেকেই বড় কিছু করার ইচ্ছা দেখেছিলাম। তার শিক্ষক হতে পারাটা আমার জন্য গর্বের।’

এতদিন শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধা, শেখা আর প্রশংসায় ভরা। কিন্তু বিশ্বকাপের ফাইনালে সেই সম্পর্কের জায়গা নেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। নব্বই মিনিটের লড়াই শেষে দেখা যাবে—বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে জয় হাসবে শিক্ষকের মুখে, নাকি শিষ্যই ছাপিয়ে যাবেন তার গুরুকে।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #বিশ্বকাপ ফাইনাল #শিরোপা #আর্জেন্টিনা #স্পেন