ভারতের চিকিৎসা শিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষা (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে চলমান আন্দোলনে সরকারের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন, এবার তারা কোনো মন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে বৈঠক করবেন না; আলোচনা হলে তা যন্তর মন্তরের কাছাকাছি কোনো নিরপেক্ষ স্থানে হতে হবে।
বুধবার (২২ জুলাই) সকালে সিজেপির প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস জানান, পুলিশ তাদের কাছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডার আলোচনার আগ্রহের কথা জানিয়েছে। তবে আগের বৈঠকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করানোর অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবার তারা কোনো মন্ত্রীর কার্যালয়ে যাবেন না। প্রয়োজনে যন্তর মন্তরের কাছাকাছি নিরপেক্ষ স্থানে বৈঠক হতে পারে।
এদিকে একই দিনে কালো পোশাক পরে সংসদ ভবনের বাইরে বিক্ষোভ করেন বিরোধী দলগুলোর নেতারা। শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের অভিযানের প্রতিবাদ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে এই কর্মসূচি পালন করা হয়।
লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, বাম দল, রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি), তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) ও ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার (জেএমএম) সংসদ সদস্যরা সরকারবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেন। এর আগে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র ফ্লোর নেতারা রাজ্যসভার বিরোধীদলীয় নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গের কক্ষে বৈঠক করে কর্মসূচির কৌশল ঠিক করেন।
এর আগের দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে পুলিশ আটক করেছিল। পরে মঙ্গলবার রাতে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
আটকের সময় ধারণ করা এক ভিডিও বার্তায় রাহুল গান্ধী প্রশ্ন তোলেন, কেন ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে এবং কেন বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটছে। তিনি এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা এবং শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের অভিযানের জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদির ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান।

ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের তৎপরতা
গত মাসে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মন্তব্য করেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, নিট পরীক্ষা নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে সরকার শতভাগ প্রস্তুত এবং শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক প্রতিটি উদ্বেগের জবাব দিতে চায়।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে নির্ভুল পরীক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সরকারি সূত্রের বরাতে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, কেন্দ্র সরকার নিট ইস্যুতে সংসদে আলোচনায় রাজি হলেও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি মানতে প্রস্তুত নয়। সরকারের দাবি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের পেছনের ত্রুটিগুলো ইতোমধ্যে সংশোধন করা হয়েছে এবং নিট, সিইউইটি ও জেইই মেইনের ভর্তি কার্যক্রমও প্রায় স্বাভাবিক গতিতেই চলছে।
সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে বৈঠক, আন্দোলন আরও জোরদারের হুঁশিয়ারি
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অনশনরত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে মেদান্তা হাসপাতালে দেখা করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং।
সরকারি সূত্র জানায়, আদালতের নির্দেশে শনিবার যন্তর মন্তর থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর তাকে ওই বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার স্ত্রী অভিযোগ করেছিলেন, পুলিশ বেআইনিভাবে তাকে আটকে রেখেছিল।
অন্যদিকে সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা সতর্ক করে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে দাবি মেনে না নিলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হবে।
তিনি বলেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে লাখো তরুণ দিল্লিতে এসে আন্দোলনে যোগ দেবেন।

এদিকে যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে দিল্লি মেট্রো কর্তৃপক্ষ রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশের ১৬টি স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।
অন্যদিকে সমাজবাদী পার্টির কর্মীরাও দলীয় প্রধান অখিলেশ যাদবকে আটকের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন।
দলের বিধায়ক মাতা প্রসাদ পাণ্ডে অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অল্প কয়েকশ তরুণের অনলাইন উদ্যোগ হিসেবে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন ২০১৪ সালের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় তরুণনির্ভর চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে পুনরায় নিট পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধ্য করা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসকে ঘিরে একাধিক আত্মহত্যার ঘটনা—এসবের সঙ্গে কর্মসংকট ও পরীক্ষা ব্যবস্থার অনিয়ম নিয়ে তরুণদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভও যুক্ত হয়েছে।
এসি//