আন্তর্জাতিক

ঋণের বোঝায় গভীর সংকটে যুক্তরাষ্ট্র!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের বোঝা প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। অতিরিক্ত সরকারি ব্যয়, ঋণের সুদ এবং দীর্ঘদিনের বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে ধার নেওয়ার ফলে দ্রুত বাড়ছে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির ঋণ। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৬ সালের মধ্যে এই ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ দৈনিক ঋণ ও নগদ হিসাব অনুযায়ী, মঙ্গলবার দেশটির মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ০৪৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে জনগণের কাছে থাকা ট্রেজারি সিকিউরিটির পরিমাণ ৩২ দশমিক ২৬৬ ট্রিলিয়ন ডলার। আর সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে থাকা ঋণের পরিমাণ ৭ দশমিক ৭৮২ ট্রিলিয়ন ডলার।

মাত্র এক দশকেরও কম সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশটির মোট ঋণ ছিল প্রায় ১৯ দশমিক ৯৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এরপর থেকে ঋণ বেড়েছে প্রায় ২০ ট্রিলিয়ন ডলার।

এই বৃদ্ধির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হয়েছে করোনাভাইরাস মহামারির মাত্র দুই বছরে। মহামারি মোকাবিলায় বিপুল সরকারি ব্যয় এবং ধার নেওয়ার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন—দুই প্রশাসনেরই ভূমিকা ছিল।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাকি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে দুই প্রশাসনের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজস্বনীতি এবং দীর্ঘদিন ধরে কর আদায় ও সরকারি ব্যয়ের মধ্যে থাকা ভারসাম্যহীনতা বড় কারণ।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই বিভিন্ন বাজেট পর্যবেক্ষক সংস্থা সতর্ক করে আসছিল, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করতে যাচ্ছে। ঋণ বৃদ্ধির গতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সামনে আরও বড় আর্থিক সংকট তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাড়তে থাকা ঋণের প্রভাব ইতোমধ্যেই মার্কিন অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে। ঋণের খরচ বাড়ায় বাড়ি কেনার বন্ধকী ঋণ ও গাড়ির ঋণের সুদ বাড়ছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের জন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের হাতে তুলনামূলক কম অর্থ থাকায় মজুরি বৃদ্ধির সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার চাপ তৈরি হচ্ছে।

দলনিরপেক্ষ সংস্থা কমিটি ফর আ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগিনিয়াস বলেন, ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ শুধু সরকারের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরও চাপ তৈরি করে।

তার মতে, সরকার যত বেশি ঋণ নেবে, মূল্যস্ফীতির চাপ তত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সরকারের বাজেটে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয়ের সুযোগ কমে যাবে। দেশের অভ্যন্তরীণ জরুরি পরিস্থিতি কিংবা বিদেশে অস্থিতিশীলতার সময়ও অতিরিক্ত ঋণের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

ম্যাকগিনিয়াস আরও জানান, পাঁচ মাসেরও কম সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন থেকে বেড়ে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। গত দুই দশকেরও কম সময়ে দেশটির ঋণ প্রায় চারগুণ হয়েছে। অথচ প্রথমবার এক ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের সীমায় পৌঁছাতে যুক্তরাষ্ট্রের সময় লেগেছিল ১৯৮১ সাল পর্যন্ত।

ঋণের পাশাপাশি বাড়ছে সরকারি বন্ডের সুদও। সম্প্রতি ২৫ বিলিয়ন ডলারের ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড নিলামে ২০২১ সালের পর সর্বোচ্চ সুদে বিক্রি হয়েছে।

এর কয়েক দিন পর মঙ্গলবার দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদ প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। বাজারে বিপুল পরিমাণ সরকারি বন্ড ছাড়ার কারণে বিনিয়োগকারীরা বাড়তি ঝুঁকি নেওয়ার বিপরীতে বেশি মুনাফা দাবি করছেন।

সাধারণত বন্ডের দাম ও সুদের হার পরস্পরের বিপরীত দিকে চলে। অর্থাৎ বন্ডের চাহিদা কমে দাম কমলে এর সুদের হার বেড়ে যায়।

এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের সুদ নিয়ন্ত্রণে বুধবার বড় পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট।

তিনি জানান, ১০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড পুনঃক্রয়ের কার্যক্রম দ্বিগুণ করা হবে। প্রতিটি পুনঃক্রয় কার্যক্রমে অন্তত ৪ বিলিয়ন ডলারের বন্ড কেনা হবে।

দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ঋণের খরচেও পড়ে। বিশেষ করে বাড়ির বন্ধকী ঋণ, গাড়ির ঋণ এবং ব্যবসায়িক ঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সব মিলিয়ে সরকারি ঋণ, সুদ পরিশোধের বাড়তি ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আরও গভীর আর্থিক সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #যুক্তরাষ্ট্র #জাতীয় ঋণ