আন্তর্জাতিক

ছুটির ঘণ্টা বাজিয়ে ১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থীর প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন নেপালের প্রধান শিক্ষক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

নেপালের ভয়াবহ পাহাড়ি বন্যায় যখন চারপাশে ধ্বংসের ছায়া, তখন এক শিক্ষকের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত রক্ষা করেছে ১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থীর জীবন। স্কুলের দিকে ভয়ংকর স্রোত ধেয়ে আসার খবর পেয়েই ছুটির ঘণ্টা বাজিয়ে সবাইকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দেন ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি।

ঘটনাটি ঘটে বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে। সকাল ৯টা ২০ মিনিটে এক বন্ধুর ফোন পান ৪৭ বছর বয়সী ইংরেজির শিক্ষক দাওয়াদি। ফোনে তাকে জানানো হয়, পাহাড়ি নদীতে ভয়াবহ স্রোত নেমেছে এবং গ্রামের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হচ্ছে।

প্রথমে স্কুল ভবনটিকে নিরাপদই মনে হয়েছিল তার। তিনতলা কংক্রিটের ভবনটি নদীর চেয়ে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে ছিল। নদীর পূর্ব তীরের সঙ্গে গ্রামের সংযোগকারী ইস্পাতের সেতুটিও স্কুলের কাছাকাছি উচ্চতায় ছিল।

কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক স্কুলে ছুটে এসে পানি দ্রুত বাড়ার খবর দিলে। দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে স্কুলের ঘণ্টা বাজান প্রধান শিক্ষক। শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষ খালি করে শিক্ষার্থীদের বাইরে বের করে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

একই সঙ্গে স্কুলবাসের চালকদের ফোন করে বাস ঘুরিয়ে আনতে বলেন। তবে একজন চালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। কিছুক্ষণ পর নিজের চোখেই দেখতে পান, ওই বাসটি সেতু পার হয়ে যাচ্ছে।

এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মোটরসাইকেলে করে উঁচু এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়। অন্য শিক্ষার্থীরা দৌড়ে নিরাপদ জায়গার দিকে যেতে শুরু করে। তাদের সঙ্গে ছুটে যান প্রধান শিক্ষকও।

শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা একটি বোধিবৃক্ষের নিচে আশ্রয় নেয়। এর কিছুক্ষণ পরই ভয়াবহ স্রোত স্কুল ভবনসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির দ্রুত সিদ্ধান্তের কারণে ১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থী এবং অধিকাংশ শিক্ষক-কর্মচারী নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।

তবে সবাইকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। স্কুলের সমাজবিজ্ঞান শিক্ষক ৩২ বছর বয়সী সান্তোষ পারিয়ার নদীর পাশের ভাড়া বাসায় নাশতা রান্না করতে ফিরে গিয়ে স্রোতে ভেসে মারা যান। স্কুলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সুলতান লামাও দরজা বন্ধ করতে ফিরে গিয়ে প্রাণ হারান।

ঘটনার পর স্থানীয়দের কাছে নায়ক হয়ে উঠেছেন দাওয়াদি। তবে নিজেকে নায়ক মনে করছেন না তিনি। ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্কুলের কাদামাখা ধ্বংসাবশেষের দিকে তাকিয়ে তার কাছে নিজের ভূমিকা ছিল একজন শিক্ষকের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনের মতোই।

রূপালি পর্দার কোনো কাহিনিকেও হার মানানো এই ঘটনার বিস্তারিত উঠে এসেছে দ্য টাইমসের এক প্রতিবেদনে। সেখানে ভয়াবহ বন্যার মুহূর্তে প্রধান শিক্ষকের দ্রুত সিদ্ধান্ত ও শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

সাম্প্রতিক বন্যায় নেপালে এখন পর্যন্ত ৭৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটিতে নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৪৯৮ জন। পাশাপাশি তিব্বতের গিয়েরং কাউন্টিতেও আরও ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

প্রকৃতির ভয়াবহতার সামনে কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্ত যে কত শত প্রাণ বাঁচাতে পারে, নেপালের এই ঘটনাই তার এক অসাধারণ উদাহরণ।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #নেপাল #ছুটির ঘণ্টা #প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি