জাতীয়

পুতুলই হতে চলেছেন রাজনীতিতে শেখ হাসিনার উত্তরাধিকারী!

পুতুলই হতে চলেছেন রাজনীতিতে শেখ হাসিনার উত্তরাধিকারী!
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে গত তিনটি সরকারই ভারতের সঙ্গেই সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেছে এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ওই দেশটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হাসিনার নতুন মেয়াদেও সেই ধারা বজায় থাকার সম্ভাবনা ষোলো আনা। অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতেও বাংলাদেশের গুরুত্ব বিগত দেড় দশকে ক্রমশ বেড়েছে। দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদী ও ঢাকায় শেখ হাসিনার সরকার বিগত এক দশকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের যে ‘টেমপ্লেট’ বা কাঠামোটা গড়ে তুলেছেন, সেটা আরও অন্তত পাঁচ বছর অক্ষুণ্ণ থাকবে বলে ধারণা করছে দেশটির কূটনীতিক, বিভিন্ন থিঙ্কট্যাঙ্কের বাংলাদেশ ওয়াচার ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা। তবে তাদের দৃষ্টিতে দিল্লি-ঢাকার মধ্যকার এজেন্ডায় চারটি বিষয় রয়েছে।এগুলো হলো-গঙ্গা চুক্তির নবায়ন, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, এলিফ্যান্ট ইন দ্য রুম। পাশাপাশি একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ভারতীয় বিশ্লেষকদের মনে। আর তাহলো কে হতে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী? বিশ্লেষকদের অনেকের অভিমত-সম্ভবত সায়মা ওয়াজেদকেই নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করতে চাইছেন শেখ হাসিনা। সম্প্রতি ভারতের সাবেক কূটনীতিক, বিভিন্ন থিঙ্কট্যাঙ্কের বাংলাদেশ ওয়াচার ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তৈরি বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দিল্লি সফরে গেছেন বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই বিদেশে তার প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর। সফরকালে  তিনি বৈঠকে বসবেন  ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে। তবে টেমপ্লেট অপরিবর্তিত থাকলেও দুই দেশের আলোচনার বিষয়বস্তু বা এজেন্ডাতে পরিবর্তন আসবে সেটাই প্রত্যাশিত  কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোনও কোনও ইস্যু হয়তো বেশি গুরুত্ব দাবি করবে, কোনও কোনও বিষয়ে দ্রুত ঐকমত্যে পৌঁছনোর প্রয়োজন হবে। আগামী পাঁচ বছরে সেই প্রধান ইস্যুগুলো কী কী হতে পারে সেগুলো নিয়ে কথা বলেছেন ভারতীয় বিশ্লেষকরা। ১. গঙ্গা চুক্তির নবায়ন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত গঙ্গা চুক্তির কার্যকাল শেষ হচ্ছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরেই। ১৯৯৬ সালের ১২ই ডিসেম্বর যখন দুই দেশ ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, তখন সেটির মেয়াদ ধার্য করা হয়েছিল তিরিশ বছর। ফলে নতুন আকারে চুক্তিটি নবায়ন করার জন্য দিল্লি ও ঢাকার হাতে এখন সময় আছে আড়াই বছরের সামান্য বেশি। এরকম বড় মাপের ও গুরুত্বপূর্ণ একটি জলবন্টন চুক্তির সব দিক খতিয়ে দেখে তা নতুন করে চূড়ান্ত করার জন্য এটা আসলে খুবই অল্প সময়। তবে ভারত ও বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও যৌথ নদী কমিশনের কর্মকর্তাদের ভেতর গঙ্গা চুক্তির নবায়ন নিয়ে কথাবার্তা এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) সেন্টার ফর সাউথ এশিয়া স্টাডিজের সাবেক প্রধান, অধ্যাপক বলদাস ঘোষাল বলেছেন, ‘১৯৯৬ সালে ভারতের এইচ ডি দেবেগৌড়া সরকার ও বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকারের মধ্যে যখন মূল চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের তাতে কিন্তু সানন্দ সম্মতি ছিল। বস্তুত গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির সরকার যেভাবে প্রস্তাবিত তিস্তা চুক্তির সম্পাদনে বাধা দিয়ে আসছে, তাতে গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও যে একটা আশঙ্কা তৈরি হয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বলদাস ঘোষাল অবশ্য পাশাপাশি এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, রাজনীতিতে আড়াই বছর অনেকটা দীর্ঘ সময়। এর মাঝে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বহু সমীকরণ বদলে যেতেই পারে। ২. মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর বাংলাদেশে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় বঙ্গোপসাগরের উপকূলে মাতারবাড়িতে গড়ে তোলা হচ্ছে সে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্র বন্দর বা ডিপ সি পোর্ট। বাংলাদেশের বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে মাতারবাড়ি মাত্র ৩৪ নটিক্যাল মাইল দূরে। ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে, অর্থাৎ আর মাত্র বছরতিনেকের মধ্যেই এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। এই মুহুর্তে সেখানে কাজ চলছে জোর কদমে। প্রায় দীর্ঘ দশ বছর ধরে প্রধানত জাপানের ঋণে ২৮ বিলিয়ন ডলার খরচ করে এই মাতারবাড়ি প্রকল্পটি গড়ে তোলা হচ্ছে। জাপান এখানে প্রধান সহযোগী দেশ হলেও মাতারবাড়িতে ভারতেরও বিরাট ‘স্টেক’ আছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। ভারতও নানা কারণে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরটি চালু হওয়ার অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে দিন গুনছে। দিল্লিতে কানেক্টিভিটি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদ প্রবীর দে এবিষয়ে ‘বাংলাদেশ ও ভারতের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মাতারবাড়ি ডিপ সি পোর্টকে ‘গেমচেঞ্জার’ বলে মনে করার যথেষ্ঠ কারণ আছে। এমন কী চট্টগ্রামও যে সুবিধাটা ভারতের নর্থ-ইস্টকে দিতে পারেনি, সেটাও মাতারবাড়ি দিতে পারবে।আর ঠিক সে কারণেই পরবর্তী পাঁচ বছরে ভারত ও বাংলাদেশের যাবতীয় দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় এই প্রকল্পটি ঘুরেফিরে আসবে, তা বলাই বাহুল্য’ ৩. অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে  প্রধানমন্ত্রী হাসিনা তার নতুন সরকারে এমন একজনকে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন, যিনি আগে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র সচিবের পদ সামলেছেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে এ এইচ মাহমুদ আলীকে নিয়োগ করায় ধারণা করা হচ্ছে, ‘ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি’ বা ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’ বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারের কাছে খুবই গুরুত্ব পাবে। বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণদাতা দেশ বা নানা আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সরকারকে এখন জটিল আলোচনা ও দেনদরবার চালাতে হবে, এমনটাই অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। সম্ভবত এ কারণেই একজন পোড়খাওয়া কূটনীতিবিদকে অর্থমন্ত্রীর ভূমিকায় আনা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সব চেয়ে বড় প্রতিবেশী ভারত কী ধরনের ভূমিকা নেয়, সে দিকেও স্বভাবতই পর্যবেক্ষকদের নজর থাকবে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার ও দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব (ইকোনমিক রিলেশনস) পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী অবশ্য মনে করেন বাংলাদেশে এমন কোনও গভীর সংকট নেই যে ভারতকে তাদের ‘বেইল আউট’ করার কোনও দরকার হবে। ৪. এলিফ্যান্ট ইন দ্য রুম যে জটিল সমস্যা বা কঠিন পরিস্থিতির কথা সবাই জানে, অথচ চট করে বা প্রকাশ্যে সেটা নিয়ে কেউ কথা বলতে চায় না-সেই অবস্থাটা বোঝাতে ইংরেজিতে ‘এলিফ্যান্ট ইন দ্য রুম’ - এই ফ্রেজ বা শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হয়। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা অনেকেই মনে করেন, ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যেও এরকমই একটা ‘এলিফ্যান্ট ইন দ্য রুম’ আছে। এবং সেটা আর কিছুই নয় ‘ চীন ফ্যাক্টর’। বস্তুত ঘরের পাশে বাংলাদেশে চীন কতটা আর কীভাবে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে, অথবা বেইজিং কীভাবে ঢাকাকে কাছে টানার চেষ্টা করছে সে দিকে ভারত সব সময় সতর্ক নজর রাখে। কিন্তু বিষয়টা নিয়ে প্রকাশ্যে কখনোই মন্তব্য করা হয় না। উল্টোদিকে বাংলাদেশও প্রকাশ্যে অন্তত সব সময়ই চীন ও ভারতের মধ্যে একটা ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’ বজায় রাখার চেষ্টা করে চলে। কিন্তু ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কের মধ্যে চীন ফ্যাক্টর কোনওভাবে ছায়াপাত করছে, এটা তারাও স্বীকার করতে চান না। মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে (যাতে ভারতও আছে) বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করতে অতি সম্প্রতিও আন্তর্জাতিক স্তরে কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা গেছে। অন্য দিকে বাংলাদেশ ‘কোয়াড’ জোটে ভিড়লে দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হবে, প্রকাশ্যেই এ ধরনের প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি এসেছে চীনের কাছ থেকে। এই পরিস্থিতিতে তথাকথিত ‘চীন ফ্যাক্টর’ যে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে আগামীতে আরও প্রবলভাবে ছায়াপাত করবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ৫. শেখ হাসিনার পর কে? এই তালিকার পাঁচ নম্বর বা শেষ এন্ট্রি-টি এমন একটি ইস্যু, যা নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার টেবিলে দু’দেশের মধ্যে কখনোই কথাবার্তা হয় না। কিন্তু সম্প্রতি এই প্রশ্নটাকে ঘিরে অনানুষ্ঠানিক ও ঘরোয়া আলোচনায় জল্পনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। আর সেই ইস্যুটা হল ‘শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হবেন কে বা কারা? শেখ হাসিনার বয়স এখন ৭৬-র ওপরে। পাঁচ বছর বাদে যখন বাংলাদেশে পরবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা, তখন তার বয়স একাশি পেরিয়ে যাবে। কিন্তু তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ালে বা তার অবর্তমানে আওয়ামী লীগের হাল কে ধরবেন, সেটা নিয়ে শেখ হাসিনা এখনও স্পষ্ট কোনও ইঙ্গিত দেননি। এই বিষয়টা ভারতকে ইদানীং সামান্য অস্বস্তিতে রেখেছে। ভারতের একজন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নাম প্রকাশ না-করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘বিগত প্রায় তিন দশক ধরে ভারত বাংলাদেশে শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগের ওপরই রাজনৈতিক বাজি ধরে আসছে, বা অন্যভাবে বললে ‘ইনভেস্ট’ করে আসছে।কিন্তু শেখ হাসিনার পরে কে, বা আওয়ামী লীগে কার ওপর আমরা ভরসা রাখব সেটাও এখন আস্তে আস্তে জানা দরকার। ভারতে ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও ‘বাংলাদেশ অন আ নিউ জার্নি’ বইয়ের লেখক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, ‘বর্তমান মেয়াদের প্রথম আড়াই তিন বছর এটা নিয়ে হয়তো বিশেষ নড়াচড়া হবে না। কারণ ওই সময়কালটা খুব ‘ক্রিটিকাল’, ওইটুকু পথ পেরিয়ে যেতে পারলে সরকারের পুরো মেয়াদ শেষ করা নিয়ে আর কোনও প্রশ্ন উঠবে না। শেখ হাসিনার সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীদের মধ্যে তার বোন শেখ রেহানা, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নাম নিয়েই সবচেয়ে বেশি নাড়াচাড়া হয়ে থাকে। এছাড়া শেখ রেহানার ছেলে রেদোয়ান ববি সিদ্দিককেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রায়সময়ই দেখা যায়। সায়মা ওয়াজেদ পুতুল গত সপ্তাহেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্বাচিত আঞ্চলিক অধিকর্তার পদে তার কার্যভার গ্রহণ করেছেন।নেপালের দক্ষ ও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে এই পদে সাইমা ওয়াজেদের নির্বাচনে ভারতের একটা বড় ভূমিকা ছিল মনে করা হয়। তা ছাড়া ডব্লিউএইচও’র এই আঞ্চলিক অধিকর্তার কার্যালয়ও দিল্লিতে অবস্থিত। এর ফলে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এখন অনেকটা সময় দিল্লিতেই কাটাবেন। ভারতের নেতা-মন্ত্রী ও নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গেও তার মেলামেশা ও ঘনিষ্ঠতার সুযোগ হবে। নিজের মেয়েকে যেভাবে শেখ হাসিনা এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দায়িত্বে নিয়ে এলেন, তাতে ভারতীয় অনেক পর্যবেক্ষকেরই ধারণা তিনি সম্ভবত সায়মা ওয়াজেদকেই নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করতে চাইছেন।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন পুতুলই | হতে | চলেছেন | রাজনীতিতে | শেখ | হাসিনার | উত্তরাধিকারী