আন্তর্জাতিক

রয়টার্সের প্রতিবেদন

নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রিত্বের দ্বারপ্রান্তে তারেক রহমান

প্রায় দুই দশক নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর দেশে ফেরার দুই মাসও পূর্ণ হয়নি। এর মধ্যেই বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ঠিক তার বাবা–মায়ের মতো করেই তিনি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। এমনটাই জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানায়, আগামী বৃহস্পতিবারের নির্বাচন ৬০ বছর বয়সী শান্ত স্বভাবের তারেক রহমানের জন্য ভাগ্যের এক বিস্ময়কর পরিবর্তনের দিন হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

রয়টার্সের তথ্যমতে, ২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আটক থাকার পর মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়েন তারেক রহমান। পরে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় গেল বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। সে সময় তাকে ব্যাপক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অন্যদিকে শেখ হাসিনা বর্তমানে নয়াদিল্লিতে নির্বাসিত রয়েছেন।

তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছেন। তার বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা এবং ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করেন, পরে তিনি নিহত হন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব নতুনভাবে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারেক রহমান। তবে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল না হওয়ার নীতির কথাও বলেছেন তিনি। যা অনেকের মতে শেখ হাসিনার নীতির বিপরীত, যাকে নয়াদিল্লিকেন্দ্রিক হিসেবে দেখা হতো।

তিনি দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানো, তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে খেলনা ও চামড়াজাত শিল্পে জোর দেওয়া এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই দফায় ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করার প্রস্তাবও তুলে ধরেছেন।

রয়টার্স আরও জানায়, দেশে ফেরার পর নিজেকে এমন এক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন তারেক রহমান, যিনি অতীতের ভোগান্তি পেছনে ফেলে সামনে এগোতে চান। ২০০১–২০০৬ সময়কালে তার মা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বিএনপির যে দাপুটে ভাবমূর্তি ছিল, সেটি আর নেই। যদিও তিনি কখনো সরকারি পদে ছিলেন না, তবু নেপথ্যে সমান্তরাল ক্ষমতাকেন্দ্র পরিচালনার অভিযোগ উঠেছিল—যা তিনি বরাবরই অস্বীকার করেছেন।

প্রতিশোধের রাজনীতি প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, প্রতিশোধ মানুষকে কিছুই দেয় না, বরং এতে মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় এবং কোনো ইতিবাচক ফল আসে না। তার মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এখন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।

শেখ হাসিনার শাসনামলে তারেক রহমান একাধিক দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হন এবং অনুপস্থিতিতে দণ্ডিতও হন। ২০১৮ সালে ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা মামলায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তিনি সব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি সব মামলায় খালাস পান।

লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি দেখেছেন, তার দল নির্বাচনে প্রান্তিক হয়ে পড়ছে—জ্যেষ্ঠ নেতারা কারাবন্দি হচ্ছেন, কর্মীরা নিখোঁজ হচ্ছেন এবং দলীয় কার্যালয়গুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

দেশে ফেরার পর তিনি সংযত অবস্থান নিয়েছেন। উসকানিমূলক বক্তব্য এড়িয়ে সংযম ও সমঝোতার আহ্বান জানাচ্ছেন। ‘রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানা’ ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কথাও বলছেন—যা বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে নতুন আশাবাদ তৈরি করেছে।

দলীয় সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানায়, বিএনপির ভেতরে তারেক রহমানের নিয়ন্ত্রণ শক্ত। প্রার্থী বাছাই, কৌশল নির্ধারণ ও জোট আলোচনা—সবকিছুই তিনি সরাসরি তদারকি করছেন, যদিও একসময় এসব ভূমিকা দূর থেকেই পালন করতেন।

বংশানুক্রমিক রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠলেও তারেক রহমান বলেছেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও টিকিয়ে রাখাই হবে তার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তার মতে, গণতন্ত্রের চর্চাই দেশকে সমৃদ্ধ করে এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করে। আর সে লক্ষ্যেই দেশকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে চান তিনি।

 

এমএ//

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #তারেক রহমান #বিএনপি #নির্বাচন