প্রতিদিনের ব্যবহার—গেম খেলা, ছবি বা ভিডিও এডিট করা, কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা অ্যাপ ব্যবহার—এসবের মধ্য দিয়েই অজান্তে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য তুলে দিচ্ছেন অনেক ব্যবহারকারী। অভিযোগ উঠেছে, জনপ্রিয় কিছু মোবাইল অ্যাপের আড়ালে সক্রিয় রয়েছে ইসরাইলি গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক। এমনকি ব্যবহারকারীরা যে অর্থ খরচ করে এসব অ্যাপ কেনেন বা ব্যবহার করেন, তার একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ইসরাইলি সামরিক ব্যবস্থার অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করছে।
সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, অ্যান্ড্রয়েড ফোনের গুগল প্লে স্টোর ও আইফোনের অ্যাপ স্টোরে থাকা বহু জনপ্রিয় অ্যাপের পেছনে রয়েছে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক সদস্যরা। অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজস্ব পরিচয় গোপন রেখে বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে এসব অ্যাপ পরিচালনা করছেন। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীদের পক্ষে সহজে বোঝা সম্ভব নয় যে তাদের ব্যবহৃত অ্যাপের মালিকানার সঙ্গে কারা জড়িত।
এই অনুসন্ধান অনুযায়ী, অসংখ্য গেম, ছবি ও ভিডিও এডিটিং অ্যাপ এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা সফটওয়্যারের পেছনে রয়েছে এমন সব কোম্পানি, যেগুলোর প্রতিষ্ঠাতা বা মালিকদের অনেকেই ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা ইউনিটের সাবেক কর্মকর্তা। বিশেষ করে ‘ইউনিট ৮২০০’ নামে পরিচিত ইসরাইলের সাইবার নজরদারি ও সিগন্যাল গোয়েন্দা ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই পরে প্রযুক্তি কোম্পানি গড়ে তুলেছেন। এই ইউনিট বিশ্বজুড়ে নজরদারি প্রযুক্তি ও সাইবার সক্ষমতার জন্য পরিচিত।
এই বিষয়টি সামনে আসে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে, যা প্রকাশ করেছে মার্কিনভিত্তিক গণমাধ্যম দ্য গ্রেজোন। সাংবাদিক ম্যাক্স ব্লুমেন্থাল প্রতিষ্ঠিত এই মাধ্যমটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এবং বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য পরিচিত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইলি অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিগুলোর মধ্যে জিপোঅ্যাপস একটি উল্লেখযোগ্য নাম। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন জনপ্রিয় অ্যাপ কিনে সেগুলোতে ট্র্যাকিং ও বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি যুক্ত করে পরিচালনা করে থাকে। তাদের তৈরি বা অধিগৃহীত অ্যাপগুলোর মধ্যে কোলাজমেকার ফটো এডিটর (Collage Maker Photo Editor) এবং ইনস্টাস্কয়ার ফটো এডিটর (Instasquare Photo Editor) উল্লেখযোগ্য, যেগুলো প্লে স্টোরে কয়েক কোটি বার ডাউনলোড হয়েছে।
২০২২ সালে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী গাল আভিদর এক সাক্ষাৎকারে জানান, প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতারা সবাই ইউনিট ৮২০০–এর সাবেক সদস্য।
একইভাবে জনপ্রিয় এআইভিত্তিক ফটো এডিটিং অ্যাপ বাজার্ট (Bazaart) –এর মালিকানার সঙ্গেও জড়িত আছেন ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। এর প্রতিষ্ঠাতা ড্রোর ইয়াফে ও স্টাস গোফারম্যান দুজনেই ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। গোফারম্যান প্রায় এক দশক সামরিক গোয়েন্দা ইউনিটে কাজ করার পর ২০১১ সালে বাহিনী থেকে অবসর নেন।
অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোনে ব্যাপক ব্যবহৃত আরেকটি অ্যাপ ফেসটিউন (Facetune)। এটি লাইটট্রিক্স নামের একটি কোম্পানির তৈরি, যার সহপ্রতিষ্ঠাতা ইয়ারন ইনগারও ইউনিট ৮২০০–এ পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অ্যাপটি ৫ কোটির বেশি বার ডাউনলোড হয়েছে। কিছু ব্যবহারকারী অভিযোগ করেছেন, এই অ্যাপটি ব্যবহারকারীর ইউনিক আইডি ও লোকেশন অ্যাক্সেসের মতো সংবেদনশীল অনুমতি চায়।
মোবাইল গেমিং জগতেও ইসরায়েলি কোম্পানিগুলোর শক্ত উপস্থিতি রয়েছে। সুপারসনিক (Supersonic) নামের একটি গেম কোম্পানি বিশ্বের জনপ্রিয় কয়েকটি গেম তৈরি করেছে। তাদের বিল্ড এ কুইন (Build a Queen), গোয়িং বলস (Going Balls) এবং ব্রিজ রেস (Bridge Race) শীর্ষ ডাউনলোড হওয়া গেমগুলোর তালিকায় জায়গা পেয়েছে। কনকোয়ার কানট্রিজ (Conquer Countries) নামে এই কোম্পানির একটি গেম রয়েছে যা লাখ লাখ বার ডাউনলোড করা হয়েছে। অ্যাপটির বিজ্ঞাপনী ছবিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি কার্টুন সংস্করণ ব্যবহার করা হয়েছে। কোম্পনিটির প্রতিষ্ঠাতা নাদাভ আশকেনাজি দীর্ঘ সময় ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিমানবাহিনীর অপারেশনাল প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
অন্যদিকে, প্ল্যাটিকা (Playtika) নামের একটি বড় গেমিং কোম্পানি, যার আয় কয়েক বিলিয়ন ডলারের বেশি, সরাসরি যুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে। নাসডাক তালিকাভুক্ত এই প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের প্রায় ১৪ শতাংশ কর্মী বর্তমানে গাজা অভিযানে রিজার্ভিস্ট হিসেবে অংশ নিচ্ছেন। কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাবেক প্রধান আমনন লিপকিন-শাহাকের ছেলে উরি শাহাক।
আরেকটি বড় অ্যাপ কোম্পানি ক্রেজি ল্যাবস (Crazy Labs), যার জনপ্রিয় গেমগুলোর মধ্যে রয়েছে ফোন কেস ডিআইওয়াই (Phone Case DIY), মিরাকুলাস লেডিবাগ অ্যান্ড ক্যাট নোয়্যার (Miraculous Ladybug & Cat Noir) এবং স্কালপ্ট পিপল (Sculpt People)। এই কোম্পানির অ্যাপগুলো শত কোটি বার ডাউনলোড হয়েছে এবং এর প্রতিষ্ঠাতাদের অনেকেই ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্য।
দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত আরও কিছু অ্যাপের সঙ্গেও একই ধরনের সংযোগ পাওয়া গেছে। বিশ্বজুড়ে যাতায়াত তথ্যের জন্য ব্যবহৃত মুভিট (Moovit) অ্যাপের প্রতিষ্ঠাতা নির ইরেজ ইসরাইলি সামরিক সাইবার ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্প্যাম কল শনাক্তকারী কলঅ্যাপ (CallApp)–এর প্রতিষ্ঠাতা অমিত অনও ইউনিট ৮২০০–এর সদস্য ছিলেন। একইভাবে রাইড-হেইলিং অ্যাপ গেট (Gett) প্রতিষ্ঠা করেছেন ইউনিট ৮২০০–এর সাবেক সদস্য রোই মোর ও শাহার ওয়াইজার।
সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি হলো জিপিএস নেভিগেশন অ্যাপ ওয়েজ (Waze), যা ২০১৩ সালে গুগল প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলারে অধিগ্রহণ করে।
খাদ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণের অ্যাপ ফুডুকেট (Fooducate)–এর প্রতিষ্ঠাতা হেমি ওয়াইনগার্টেনও ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর সাবেক পাইলট।
এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, প্রযুক্তি খাতের মাধ্যমে ইসরাইলি গোয়েন্দা ও সামরিক নেটওয়ার্ক বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল জীবনের গভীরে প্রভাব বিস্তার করছে। বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারী অজান্তেই এসব অ্যাপ ব্যবহার করে তাদের ব্যক্তিগত ছবি, অবস্থান ও নানা তথ্য শেয়ার করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব তথ্য সংগ্রহ ও অ্যাপ থেকে অর্জিত বিপুল অর্থ ইসরাইলের প্রযুক্তি খাত এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরায়েলি পণ্য বর্জনের আন্দোলন—বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট ও স্যাংশনস (বিডিএস)—নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।
একই সঙ্গে গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, সাধারণ ব্যবহারকারীরা জানতেও পারছেন না তাদের ফোনে থাকা অনেক জনপ্রিয় অ্যাপের পেছনে কারা কাজ করছেন এবং সেই অ্যাপগুলো ঠিক কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করছে।
এসি//