খেলাধুলা

আর্লিং ব্রাউট হালান্ডকে জানুন পাঁচ অজানা গল্পে

স্পোর্টস ডেস্ক

বিশ্বকাপের ফাইনালের স্বপ্ন ছুঁতে নরওয়ের প্রধান ভরসা আর্লিং ব্রাউট হালান্ড। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে বিদায় করে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শেষ আটে জায়গা করে নেওয়া নরওয়ের এই সাফল্যের কেন্দ্রে রয়েছেন ২৫ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার। জোড়া গোল করে দলকে জেতানোর পাশাপাশি টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত সাত গোল নিয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার লড়াইয়েও আছেন তিনি। একই তালিকায় রয়েছেন লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপে।

সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করার পর হালান্ড মজা করে বলেছিলেন, “গোল করাই সম্ভবত আমার বিশেষত্ব।” কথাটি নিছক রসিকতা মনে হলেও পরিসংখ্যান বলছে, সেটিই বাস্তবতা। তবে মাঠের গোলমেশিন হালান্ডকে ঘিরে এমন অনেক গল্প আছে, যা অনেকেরই অজানা।

ইংল্যান্ডে জন্ম, কিন্তু হৃদয়ে নরওয়ে

২০০০ সালে ইংল্যান্ডের লিডস শহরে জন্ম হালান্ডের। তখন তার বাবা আলফ-ইঙ্গে হালান্ড খেলতেন লিডস ইউনাইটেডে। মাত্র চার বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে নরওয়ের ব্রায়ান শহরে ফিরে যান তিনি। সেখানেই ফুটবলের সঙ্গে তার বেড়ে ওঠা।

স্থানীয় কোচ আলফ ইঙ্গে বার্ন্টসেনের ভাষায়, পাঁচ বছর বয়সেই হালান্ড অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিলেন। বয়সে বড়দের সঙ্গে অনুশীলনে নেমে প্রথম দুটি স্পর্শেই গোল করেছিলেন তিনি। ১১-১২ বছর বয়সেই কোচরা বুঝে গিয়েছিলেন, এই ছেলেটি অনেক দূর যাবে।

১৫ বছর বয়সে ব্রায়ান এফকের হয়ে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করে পরে মোল্ডে এফকে-তে যোগ দেন। সেখানে তার মেন্টর ছিলেন কিংবদন্তি স্ট্রাইকার ওলে গানার সোলশার। এরপর রেড বুল সালজবার্গ, বরুশিয়া ডর্টমুন্ড পেরিয়ে এখন তিনি ম্যানচেস্টার সিটির অন্যতম বড় তারকা।

জাতীয় দলের হয়ে গোল করার মেশিন

দীর্ঘদিন বড় টুর্নামেন্টের বাইরে থাকা নরওয়ের ফুটবলে নতুন প্রাণ ফিরিয়েছেন হালান্ড। ১৯৯৮ সালের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপ খেলছে দলটি। এর আগে বড় কোনো আন্তর্জাতিক আসরে নরওয়ের শেষ অংশগ্রহণ ছিল ২০০০ সালের ইউরোতে।

জাতীয় দলের জার্সিতে হালান্ডের পরিসংখ্যানও বিস্ময়কর। শেষ ১৪টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচেই গোল করেছেন তিনি। এই সময়ে করেছেন ২৭ গোল। সব মিলিয়ে ৫৪ আন্তর্জাতিক ম্যাচে তার গোল ৬২টি। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি ৭১ মিনিটে একটি গোল।

ছয় হাজার ক্যালরির ডায়েট, দিনে ১০ ঘণ্টা ঘুম

মাঠের পারফরম্যান্সের পেছনে রয়েছে কঠোর জীবনযাপন। প্রতিদিন প্রায় ছয় হাজার ক্যালরি গ্রহণ করেন হালান্ড। তার খাদ্যতালিকায় থাকে গরুর হৃৎপিণ্ড, কলিজা, কাঁচা মধু ও দুধের মতো উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার।

নিজেকে সেরা অবস্থায় রাখতে রাতে সব ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ রাখেন এবং অন্তত ১০ ঘণ্টা ঘুমান। রেড বুল সালজবার্গে থাকার সময় থেকেই সতীর্থরা তার এই শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন দেখে মুগ্ধ ছিলেন। অবসরে তাস খেলার বদলে তিনি পড়তেন ঘুম, পুষ্টি ও শারীরিক উন্নয়ন নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা।

শেকড়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা

লিডসে জন্ম হওয়ায় চাইলে ইংল্যান্ডের হয়েও খেলতে পারতেন হালান্ড। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছেন নরওয়েকে।

নিজের শেকড়ের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে জাতীয় দলের জার্সিতে শুধু ‘হালান্ড’ নয়, ব্যবহার করেন পুরো নাম ব্রাউট হালান্ড। ‘ব্রাউট’ তার মায়ের বিয়ের আগের পারিবারিক নাম, যা নরওয়ের একটি ঐতিহ্যের অংশ।

নরওয়ের ভাইকিং ইতিহাস তাকে অনুপ্রাণিত করে। ব্যস্ত সূচির মাঝেও নিজের জন্মভূমি ব্রায়ানে নিয়মিত ফিরে যান তিনি।

মাঠের বাইরেও সুপারস্টার

এক মিটার ৯৪ সেন্টিমিটার উচ্চতা, লম্বা সোনালি চুল আর আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিত্ব—সব মিলিয়ে হালান্ড এখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ।

ইউটিউবে তার ‘এক দিনের জীবন’ধর্মী ভিডিও লাখো মানুষ দেখেন। সেখানে তার সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ১৬ লাখের বেশি। শুধু ফুটবল নয়, ‘ভাইকুইনস’ নামে একটি অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রেও কণ্ঠ দিচ্ছেন তিনি, যেখানে অভিনয় করছেন এক ভাইকিং চরিত্রে।

নরওয়ের সাংবাদিকদের মতে, হালান্ড প্রচলিত স্ক্যান্ডিনেভীয় বিনয়ী স্বভাবের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে তিনি সচেতন, আর সেই আত্মবিশ্বাসই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

ব্রাজিলকে হারিয়ে বিশ্বকাপে নতুন ইতিহাস লিখেছে নরওয়ে। সেই ইতিহাসকে আরও বড় করে তুলতে এখন তাদের সামনে ইংল্যান্ড। আর সেই স্বপ্নযাত্রার সবচেয়ে বড় ভরসা আর্লিং হালান্ড।

গোল করার সহজাত ক্ষমতা, কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণ, দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং অদম্য আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে হালান্ড শুধু একজন স্ট্রাইকার নন, তিনি এখন নরওয়ের ফুটবল ইতিহাস বদলে দেওয়া এক প্রতীক।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #আর্লিং ব্রাউট হালান্ড #নরওয়ে #গোলমেশিন