খেলাধুলা

বিশ্বকাপ নিয়ে বিরোধিতার মুখে পিছু হটল ফিফা

স্পোর্টস ডেস্ক

বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা থেকে শেষ পর্যন্ত সরে এসেছে ফিফা। বিভিন্ন মহলের তীব্র বিরোধিতা এবং সদস্য সংগঠনগুলোর আপত্তির মুখে পরিকল্পনাটি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।

ফিফার পরিকল্পনা ছিল, বিশ্বকাপসহ সংস্থার বিভিন্ন টুর্নামেন্ট পরিচালনার জন্য গঠিত হতে যাওয়া একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২০ শতাংশ অংশীদারত্ব বিক্রি করে সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিল সংগ্রহ করা।

গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) প্রস্তাবটি প্রকাশের পরপরই ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফাসহ বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে।

উয়েফা অভিযোগ তোলে, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে ফুটবলের ‘আত্মা’ বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি প্রস্তাব প্রত্যাহার না হলে বিশ্বকাপসহ ফিফার সব প্রতিযোগিতা বর্জনের হুঁশিয়ারিও দেয় তারা। একই অবস্থান নেয় উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল সংস্থা কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)। এ পরিকল্পনার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন ফিফা সভাপতির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাও।

বিরোধিতা সত্ত্বেও বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) পর্যন্ত ফিফা জানিয়ে আসছিল, তারা আলোচনা চালিয়ে যাবে। তবে একদিনের ব্যবধানে অবস্থান পরিবর্তন করে শুক্রবার বিবৃতি দেন ইনফান্তিনো।

বিবৃতিতে তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত গভীরভাবে পর্যালোচনা করার পর স্পষ্ট হয়েছে যে, এই উদ্যোগটি এমন বিভাজনের সৃষ্টি করেছে, যা আর ফিফার নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে সহায়ক নয়। ফিফার উদ্দেশ্য সবসময়ই ফুটবলকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং এগিয়ে নেওয়া। সে কারণেই প্রস্তাবটি আর এগিয়ে নেওয়া হবে না।

এর আগে ফিফা দাবি করেছিল, বাণিজ্যিক কার্যক্রমের একটি সংখ্যালঘু অংশ বিক্রির মাধ্যমে বৈশ্বিক ফুটবল উন্নয়নে বিনিয়োগের জন্য শত শত কোটি ডলার সংগ্রহ সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পরিকল্পনাটি নিয়ে বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনার অভিযোগও তোলে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে।

ইনফান্তিনো সদস্য সংগঠনগুলোর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছিলেন, আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রস্তাবে সম্মতি দিলে প্রতিটি সদস্য সংস্থা ৪ কোটি মার্কিন ডলার করে পাবে। তবে সেই প্রস্তাব কাঙ্ক্ষিত সমর্থন না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ঐকমত্যের পথেই হাঁটতে হয়েছে ফিফাকে।

নতুন বিবৃতিতে ইনফান্তিনো জানান, আগামী দিনগুলোতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আবারও একত্রিত করে ফুটবলের উন্নয়ন অব্যাহত রাখাই তার লক্ষ্য। বিশেষ করে যেসব দেশে ফুটবলের জন্য আরও বেশি সহায়তা প্রয়োজন, সেখানে উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদারে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

প্রস্তাবটি প্রকাশের পর থেকেই বিরোধিতা ক্রমেই তীব্র হতে থাকে।

বৃহস্পতিবার উয়েফার ৫৫ সদস্য দেশ সর্বসম্মতিক্রমে জানায়, পরিকল্পনা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তারা ফিফার সব টুর্নামেন্ট বর্জন করবে। তাদের বক্তব্য ছিল, বিশ্বকাপ কিংবা ফুটবলকে কোনোভাবেই বিনিয়োগ পণ্যে পরিণত করা যায় না।

একই দিনে ৪১ সদস্যের কনকাকাফও আনুষ্ঠানিক বৈঠকে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে। পরে ৪৭ সদস্যের এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনও উয়েফা ও কনকাকাফের অবস্থানের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে।

উয়েফা, কনকাকাফ এবং এএফসির সম্মিলিত সদস্যসংখ্যা ১৪৩, যা ফিফার মোট ২১১ সদস্যের অর্ধেকেরও বেশি। পরিকল্পনাটি কার্যকর করতে সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন প্রয়োজন হওয়ায় ভোটাভুটিতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে— এমন বাস্তবতাও সামনে চলে আসে।

ফিফার ভেতরেও এ পরিকল্পনা নিয়ে মতভেদ ছিল। সভাপতির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস করডেরো এটিকে ‘ফুটবলের জন্য খারাপ চুক্তি’ উল্লেখ করে পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে সংস্থাটির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন লামুখ পরিকল্পনাটিকে ‘একজন ব্যক্তির প্রকল্প’ আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেন, ইনফান্তিনো কর্মীদের সঙ্গে স্বচ্ছতা বজায় রাখেননি।

এদিকে আগামী বছর ফিফা সভাপতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ৫৬ বছর বয়সী ইনফান্তিনো আবারও নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। উত্তর আমেরিকার ফুটবল প্রশাসক ভিক্টর মন্টালিয়ানি তার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে।

শুরু থেকেই পরিকল্পনার বিরোধিতা করা ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ফিফার নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ইনফান্তিনো উপযুক্ত ব্যক্তি নন।

ফিফা বিশ্বকাপ ও অন্যান্য প্রতিযোগিতা পরিচালনার জন্য ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই)’ নামে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি সহায়ক প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা করেছিল।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ক্যাপিটালের প্রতিষ্ঠাতা জশুয়া কুশনারের নেতৃত্বাধীন ‘থ্রাইভ ইটার্নাল’ সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর নেতৃত্বে থাকার কথা ছিল। জশুয়া কুশনার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই।

ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি আগেই আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ২০২৬ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক ছিল। তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ফিফার এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে ইনফান্তিনোর সঙ্গে তার কোনো আলোচনা হয়নি।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #বিশ্বকাপ #ফিফা #জিয়ান্নি ইনফান্তি