রংপুরে নৃশংসভাবে ৪ খুন

দুই আসামির জবানবন্দিতে মিলল চাঞ্চল্যকর নতুন তথ্য

বায়ান্ন প্রতিবেদন

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি সীমান্ত দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বেশ কিছু নতুন তথ্য উঠে এসেছে। পাশাপাশি ময়নাতদন্ত ও পুলিশের তদন্তেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।

নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দুজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধ অথবা গলায় ফাঁস দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দুই আসামির আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সীমান্ত দাস জানিয়েছেন, তিনি একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করেন। অন্যদিকে সিদ্ধার্থ দাস পেশায় স্বর্ণের দোকানের কারিগর। গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সঙ্গে সিদ্ধার্থদের বাড়ি পাশাপাশি ছিল। গণপতি চক্রবর্তী যে জমিতে বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন, সেটি একসময় সিদ্ধার্থদের পূর্বপুরুষদের মালিকানাধীন ছিল। পরে ওই জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেন গণপতি চক্রবর্তী।

জবানবন্দির তথ্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থ দাস আগে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন উৎসবের সময় ইয়াবা সেবন করতেন। তবে হত্যাকাণ্ডের আগের এক মাস ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার তিনি একটি করে ইয়াবা সেবন করতেন।

সিদ্ধার্থের বড় ভাইয়ের সম্প্রতি বিয়ে হওয়ায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণে প্রায় ছয় থেকে সাত মাস ধরে তিনি বিজয় কাকুর বাসায় রাত কাটাতেন এবং সেখানেই খাবার খেতেন। তবে ঘটনার আগের এক মাস ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার তিনি সীমান্ত দাসদের বাসায় থাকতেন।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত দাস কোনো ধরনের নেশা করতেন না এবং হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তিনি কিছু জানতেন না বলে আদালতে জানিয়েছেন। তার জবানবন্দি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে রেকর্ড করা হয়েছে।

সিদ্ধার্থের বক্তব্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর তিনি ইয়াবা নিয়ে মুগ্ধকে সঙ্গে করে সীমান্তদের বাসায় যান। সেখানে দুজন মিলে তিনটি ইয়াবা সেবন করেন। রাত ৩টার দিকে আরও ইয়াবা সেবনের ইচ্ছা হলে তারা ইয়াবা ব্যবসায়ী শান্তর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। এরপর শান্তর বাড়ির সামনে থেকে আরও চারটি ইয়াবা সংগ্রহ করেন। তদন্তে ওই ইয়াবা ব্যবসায়ীর পরিচয় পাওয়া গেছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

ইয়াবা নেওয়ার সময় তারা মোবাইল ফোন বন্ধক রেখেছিলেন। পরে ঘটনার পর তারা ওই বাড়ি থেকে ১৫ হাজার টাকা নেন। এর মধ্যে সিদ্ধার্থ ভাগে পান ৩ হাজার ৫০০ টাকা। ওই টাকা দিয়ে তিনি বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন। চারটি ইয়াবা নেওয়ার পর তারা আবার সীমান্তদের বাসায় যান। রাত ৩টার পর সেখান থেকে বের হন। রাস্তায় কুকুর থাকায় তারা সরাসরি না গিয়ে দেয়াল টপকে দেবুদের বাড়িতে প্রবেশ করেন। দেবুদের বাড়ির ছাদ ছিল খোলা। সেখানে বাতাস চলাচল করত। এরপর তারা ওই ছাদ থেকে গণপতি স্যারের বাড়ির ছাদে যান। দুই ছাদের মধ্যে দূরত্ব ছিল প্রায় দুই থেকে আড়াই ফুট।

গণপতি স্যারের ছাদের চারপাশে হাফওয়াল ছিল। ফলে বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না। পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে তারা ইয়াবা সেবন শুরু করেন। তারা ইয়াবা সেবন করতে করতে খেয়াল করেননি কখন ভোর হয়ে গেছে।

সিদ্ধার্থের জবানবন্দি অনুযায়ী, সেদিন তারা মোট আটটি ইয়াবা সেবন করেন। জীবনে এর আগে তারা একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুটি ইয়াবা সেবন করেছিলেন। মুগ্ধের জবানবন্দিতে অবশ্য সেদিন ৯টি ইয়াবা সেবনের কথা এসেছে। এটি আটটি ও পরে আরও একটি ইয়াবা সেবনের হিসাব হতে পারে।

পরে ভোরে গণপতি চক্রবর্তী স্যার ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাদের দেখে ফেলেন। তিনি তাদের ধমক দিয়ে বলেন, তোরা এত সকালে এখানে কী করিস? তখন তারা ভয় পেয়ে যায়। তাদের আশঙ্কা ছিল, স্যার চিৎকার করলে বিষয়টি সবাই জেনে যাবে। মান-সম্মানের ভয়েও তারা স্যারকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় বলে জবানবন্দিতে এসেছে। সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ স্যারের গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে দুইদিক থেকে টান দেন। একপর্যায়ে স্যার মারা যান। পরে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে শ্বাসরোধজনিত মৃত্যুর বিষয়টি উঠে আসে। তাদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে ময়নাতদন্তের ওই তথ্যের মিল পাওয়া গেছে।

গণপতির মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখার সময় শব্দ পেয়ে সম্ভবত তার স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে চলে আসেন। তারা চিৎকার শুরু করেন। তখন মুগ্ধ গণপতির স্ত্রীর গলা চেপে ধরেন আর সিদ্ধার্থ মেয়ের গলা চেপে ধরেন। একপর্যায়ে গণপতির স্ত্রীর গলায় থাকা গামছা দিয়েই মেয়েটির গলায় প্যাঁচ দেওয়া হয়। পরে পাশের কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি নিয়ে মেয়েটির গলায় পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেওয়া হয়। এভাবে মা ও মেয়েকেও হত্যা করা হয়। এরপর বাড়িতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কি না, সেই আশঙ্কা থেকে তারা নিচতলায় যান। সেখানে একটি পুরোনো প্লাস পান। সেটি দিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেন, যাতে কোনো ক্যামেরা থাকলেও সেটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

পরে তারা আবার ছাদে যান। মা ও মেয়ের মরদেহ ছাদের গেটের ভেতরে সিঁড়ির দিকে রেখে দেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, দেবুদের বাড়ির ছাদ থেকে যেন মরদেহ দেখা না যায়। এরপর তারা গণপতির ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানে গিয়ে দেখেন, শিশুটি ঘুম থেকে উঠছে। শিশুটি সিদ্ধার্থকে চিনতে পারে এবং বলে, সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন? এর আগে শিশুটি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল বলে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, তখন সেই তথ্যের ভিত্তিতেই বিষয়টি জানানো হয়েছিল। কিন্তু আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তারা বলেছে, শিশুটি ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলে এবং তার নাম ধরে ডাকে।

শিশুটি চিৎকার করে অন্যদের জানিয়ে দিতে পারে— এই আশঙ্কায় তারা তাকে হত্যা করে।

জবানবন্দি অনুযায়ী, কাপড় দিয়ে শিশুটির গলায় প্যাঁচ দিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়। এরপর তারা দুজনই অনেকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তারা গোসল করেন। গোসলের পর তাদের কাছে থাকা আরেকটি ইয়াবা সেবন করেন। এরপর মুগ্ধের মাথায় বাড়িটিকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর পরিকল্পনা আসে। তারা ঘরের ড্রয়ার খুলে জিনিসপত্র এলোমেলো করতে থাকেন। মুগ্ধ বিভিন্ন অলংকার এনে দেন। সিদ্ধার্থ সেগুলো প্লাস্টিকের বাক্স ও কাপড়ের প্যাকেটে রাখেন।

বাড়ি থেকে তারা ১৫ হাজার টাকা নেন। জুমার নামাজের সময় বাইরে মানুষের চলাচল কমে গেলে তারা গণপতির বাড়ির ছাদ থেকে দেবুদের বাড়ির ছাদে যান। এরপর দেয়াল টপকে বাইরে বের হয়ে যান। মুগ্ধ ১৫ হাজার টাকা নিয়ে যান। আর স্বর্ণালংকারের ব্যাগ নিয়ে সিদ্ধার্থ একটি গলিতে যান। পরে কাউকে বুঝতে না দিয়ে পূর্ণিমা নামে এক কাকির বাড়ির পেছনে মাটির নিচে স্বর্ণালংকারগুলো রেখে দেন। পূর্ণিমা ও তার স্বামী বিজয় এসব বিষয়ে কিছুই জানতেন না।

এরপর সিদ্ধার্থ বাড়িতে গিয়ে আবার গোসল করেন। পরে মুগ্ধের কাছে গিয়ে তার ভাগের ৩ হাজার ৫০০ টাকা নেন। ওই টাকা দিয়ে বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন। পরদিন সিদ্ধার্থ স্বাভাবিকভাবে দোকানে কাজে যান। অন্যদিকে মুগ্ধ বাড়িতেই ছিলেন। পরে পুলিশ মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করে।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সিদ্ধার্থের পাশাপাশি অপর আসামি মুগ্ধ দাসের নামও উঠে এসেছে। মুগ্ধের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও ঘটনার বিষয়ে একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।

 

এসি//

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #রংপুর #চার খুন #জবানবন্দি