ক্যাম্পাস

গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম শক্তিশালী ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক : জাককানইবি উপাচার্য

সানজানা আলম, জাককানইবি প্রতিনিধি

 

দ্বিতীয় সমাবর্তনের অপেক্ষা, আবাসন সংকট, গবেষণার প্রসার, আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান এবং শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এখন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে ভবিষ্যতে কোন পথে এগিয়ে নিতে চায় প্রশাসন,

এসব নিয়ে বায়ান্ন টিভির সঙ্গে কথা বলেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ম উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন।

 বায়ান্ন টিভি: উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন?

 উপাচার্য: আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে চাই, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু একাডেমিক জ্ঞান অর্জন করবে না, বরং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাও অর্জন করবে। সে কারণে শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ বাড়ানো এবং বৈশ্বিক শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমের সঙ্গে আরও সম্পৃক্ত হওয়ার দিকেও আমরা মনোযোগ দিচ্ছি।

বায়ান্ন টিভি: দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় সমাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন গ্র্যাজুয়েটরা। এ বিষয়ে প্রশাসনের বর্তমান অগ্রগতি কী?

উপাচার্য: দ্বিতীয় সমাবর্তন আমাদের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। সমাবর্তন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, সময় এবং সমন্বিত প্রস্তুতির বিষয় রয়েছে। আমরা এ খাতে অর্থ সংরক্ষণ করছি এবং সম্ভাব্য সহযোগিতার বিষয়গুলোও বিবেচনা করছি। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার কারণে বিষয়টি আমাদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও অর্থায়নের বিষয়গুলো সমন্বয় করে এমন একটি আয়োজন করতে চাই, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

বায়ান্ন টিভি: শিক্ষার্থীদের অন্যতম দাবি আবাসন সুবিধা বৃদ্ধি। এ সংকট সমাধানে কী পরিকল্পনা রয়েছে?

উপাচার্য: বর্তমানে চারটি আবাসিক হলে মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৩০ শতাংশের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। নতুন দুটি বৃহৎ হল নির্মাণের কাজ শেষ হলে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী নতুনভাবে আবাসনের সুযোগ পাবে। এতে আবাসন সুবিধার পরিধি প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় অতিরিক্ত জমিতে আরও আবাসিক অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

বায়ান্ন টিভি: গবেষণাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে প্রশাসন কী ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে?

উপাচার্য: গবেষণার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করতে আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের গবেষণায় উৎসাহিত করতে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি অনুষদের সেরা শিক্ষার্থীকে ডিনস অ্যাওয়ার্ডদেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের কিউ-ওয়ান জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাকর্মকে বিশেষ স্বীকৃতি ও পুরস্কারের আওতায় আনা হচ্ছে। আমরা চাই গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম শক্তিশালী ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক এবং নতুন প্রজন্ম গবেষণার প্রতি আরও আগ্রহী হয়ে উঠুক।

বায়ান্ন টিভি: আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান উন্নয়নে আপনার পরিকল্পনা কী?

উপাচার্য: বর্তমানে আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রে গবেষণার মান ও গবেষণার প্রভাবকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই আমরা গবেষণার পরিধি বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রকাশনা এবং বৈশ্বিক গবেষণা সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের কয়েকজন শিক্ষকের গবেষণাকর্ম ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সাইটেশন অর্জন করেছে। এ ধারা আরও বিস্তৃত করতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অবস্থানও শক্তিশালী হবে।

বায়ান্ন টিভি: শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বাড়াতে শিল্পখাতের সঙ্গে কী ধরনের সমন্বয় করা হচ্ছে?

উপাচার্য: আমরা বিশ্বাস করি, আধুনিক উচ্চশিক্ষা বাস্তব কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া প্রয়োজন। এ লক্ষ্যেই শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে বিভিন্ন সেমিনার ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের গবেষণা, থিসিস ও প্রকল্পভিত্তিক কাজে সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে। বিশেষ করে ত্রিশাল, ভালুকা ও গাজীপুর অঞ্চলের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ এবং কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে।

বায়ান্ন টিভি: বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে?

উপাচার্য: নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে। কোনো ধরনের অনৈতিক প্রভাব, তদবির বা পক্ষপাতিত্ব গ্রহণ করা হবে না। আমরা একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। চাকরিপ্রার্থীদেরও অনুরোধ করব, তারা যেন কোনো ধরনের দালাল বা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সুযোগ পাওয়ার চেষ্টা না করেন এবং নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখেন।

বায়ান্ন টিভি: পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত ক্যাম্পাস গঠনে প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী?

উপাচার্য: ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি আমরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছি। এ জন্য বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ বোটানিক্যাল সোসাইটি এবং বুয়েটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে একটি মাস্টারপ্ল্যান অনুসরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কোনো কারণে একটি গাছ অপসারণ করতে হলে তার পরিবর্তে অন্তত ১০টি নতুন গাছ রোপণ করা হবে।

বায়ান্ন টিভি: বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও ইতিহাস সংরক্ষণে নতুন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি?

উপাচার্য: একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ের সঙ্গে তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্মারক এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এসব উপাদানকে কেন্দ্র করে সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে।

বায়ান্ন টিভি: বর্তমান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা কী?

উপাচার্য: আমি চাই শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না থেকে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমে আরও বেশি সম্পৃক্ত হোক। তাদের জন্য ই-লাইব্রেরিসহ বিভিন্ন একাডেমিক সুবিধা সম্প্রসারণের কাজ চলছে। নিজেদের দক্ষতা ও যোগ্যতা বাড়ানোর মাধ্যমে তারা যেন দেশ ও সমাজের জন্য ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আই/এ