দেশজুড়ে

দুই দশক ধরে অতিথি পাখিদের পরম মমতায় আগলে রেখেছেন নাজিরপাড়া গ্রামের মানুষ

নজরুল ইসলাম, পঞ্চগড় প্রতিনিধি

ভোরের আলো ফুটতেই কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। ডানা ঝাপটে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে চলে পাখির দল। কোনো কোনো গাছে মা পাখি পরম মমতায় আগলে রেখেছে তার সদ্যজাত ছানাদের, আবার কোথাও দূর থেকে গলায় করে আনা খাবার ছানাদের মুখে উগলে দিচ্ছে মা পাখি।

পঞ্চগড় জেলার বোদা পৌর এলাকার নাজিরপাড়া গ্রামে প্রতি বছরই দেখা মেলে প্রকৃতির এমন এক অনন্য ও অপরূপ দৃশ্যের। বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই নাজিরপাড়া গ্রামটি রূপ নিয়েছে দেশি ও পরিযায়ী পাখিদের এক নিরাপদ অভয়ারণ্যে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিল মাসের দিকে এই অঞ্চলে প্রচুর খাবারের সন্ধান মেলায় হাজার হাজার পরিযায়ী ও দেশি পাখি এখানে ছুটে আসে। ওই গ্রামের বিভিন্ন গাছে বাসা বেঁধে দির্ঘদিন অবস্থান করে। নাজিরপাড়া গ্রামে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শহিদ গোলাম কিবরিয়া সেলিমের বাড়ির ছাদ থেকে তাকালেই চোখে পড়ে এক জাদুকরী দৃশ্য। তার বাড়ির চারপাশের আম, জাম, নারিকেল, সুপারি, মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় গাছের ঝোপঝাড় ও লতাপাতায় ঢেকে আছে অসংখ্য পাখির বাসা। এখানে আশ্রয় নেওয়া পাখিদের মধ্যে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় শামুকখোল, পানকৌড়িরাতচরা, ঘুঘু, সাদা বক সহ কয়েক প্রজাতির বক ও বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখি। বিশেষ করে বহুদূর থেকে আসা শামুকখোল পাখিগুলো দেখতে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়। পাখি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন শত শত পর্যটক ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।

প্রায় ৬ থেকে ৭ মাস এই গ্রামে বংশবিস্তার ও অবস্থান করার পর অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে পাখিরা আবার তাদের গন্তব্যে ফিরে যায়। দীর্ঘ ২০-২৫ বছর ধরে পাখিদের এই আগমনকে কেন্দ্র করে গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রায় এক দারুণ পরিবর্তন এসেছে।

 যদিও হাজার হাজার পাখির বিষ্ঠা,মলমূত্রে গ্রামের বাড়ির উঠোন, বারান্দা, বাঁশঝাড় ও রাস্তাঘাট নোংরা হয়, ছড়ায় তীব্র দুর্গন্ধ। কিন্তু প্রকৃতির এই সুন্দর সৃষ্টিকে ভালোবেসে সব ধরনের অসুবিধা ও কষ্ট অনায়াসে উপেক্ষা করে চলছেন নাজিরপাড়ার বাসিন্দারা।এ যেন পাখির প্রতি তাদের এক অন্যরমক ভালবাসা।

গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শহিদ গোলাম কিবরিয়া সেলিম বলেন, "পাখিগুলো প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিলের দিকে এখানে আসে। কারণ এই সময়ে তারা এখানে প্রচুর খাবার পায়। প্রায় ৬ থেকে ৭ মাস থেকে তারা আবার চলে যায়। এদের মলমূত্রের কারণে আমাদের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট নোংরা হয়, দুর্গন্ধও ছড়ায়। কিন্তু আমরা এগুলোকে কোনো সমস্যাই মনে করি না। এরা আমাদের গ্রামের অতিথি এবং প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। আমরা পরম মমতায় এদের আগলে রাখি।"

নাজিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা এখন পাখিদের অতন্দ্র প্রহরী। স্থানীয় তরুণ ও সাধারণ মানুষ একজোট হয়ে পাখিদের দেখভাল করেন। গ্রামে বহিরাগত কাউকে পাখি শিকার করতে বা কোনো ধরনের ক্ষতি করতে দেওয়া হয় না। গ্রামবাসীদের এমন পরিবেশবান্ধব ও মানবিক উদ্যোগের কারণে পাখি শিকারিদের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে বছরের পর বছর ধরে এখানে পাখিরা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, পৌরসভা বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি নিয়মিত ব্লিচিং পাউডার ছিটানো বা পরিষ্কারের ব্যবস্থা করা হতো, তবে পরিবেশ আরও ভালো থাকত। অবশ্য ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনেও এই পাখিরা বড় ভূমিকা রাখছে বলেও তারা মনে করেন

বোদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রবিউল ইসলাম বলেন, "নাজিরপাড়া প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ একটি অনন্য এলাকা। দীর্ঘদিন ধরে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি এখানে এসে বাসা বাঁধে ও বংশবিস্তার করে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার এলাকাটি পরিদর্শন করে স্থানীয়দের সচেতন করা হয়েছে। পাখিগুলো যে গাছগুলোতে বাসা বাঁধে, সেসব গাছ না কেটে সংরক্ষণের জন্য আমরা স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুরোধ জানিয়েছি।" 

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক  শুকরিয়া পারভীন জানান, "পঞ্চগড়ের নাজিরপাড়া, মহারাজার দিঘি, ময়দানদিঘি সহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতি বছর পাখির আগমন ঘটে। বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জেলা প্রশাসন সদা তৎপর। পাখিদের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে এবং কোনো ধরনের শিকার বা নিষ্ঠুরতা বন্ধে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হচ্ছে।"

স্থানীয় পরিবেশবাদীরা মনে করেন, সরকারি বা বেসরকারিভাবে যদি এই গ্রামটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে পাখির অভয়ারণ্যহিসেবে ঘোষণা করে রক্ষণাবেক্ষণের আরও জোরদার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে এটি উত্তরবঙ্গের একটি অন্যতম দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

আই/এ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #পঞ্চগড় #অতিথি পাখি