যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ক্ষমতার সমীকরণ বদলে গেল এক রাতেই। দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান আধিপত্য ভেঙে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। একের পর এক রিপাবলিকান-অধ্যুষিত অঙ্গরাজ্যে জয় ছিনিয়ে নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দলকে বড় ধরনের নির্বাচনী ধাক্কা দিয়েছে তারা। এর মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনে ট্রাম্প প্রশাসনের একক দলীয় নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটল। মঙ্গলবারের (০৩ নভেম্বর) মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসন বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। এবারের নির্বাচনে সাউথ ক্যারোলাইনা, নর্থ ক্যারোলাইনা, টেক্সাস, কানসাস, ওহাইও ও আইওয়ায় জয় পেয়ে সেই লক্ষ্য অর্জন করেছে দলটি। বিশেষ করে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাস, কানসাস ও সাউথ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাটদের জয়কে নির্বাচনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাউথ ক্যারোলাইনা ও নর্থ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকানদের হার
সাউথ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান সিনেটর ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও চিকিৎসক অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ২৮ বছর পর অঙ্গরাজ্যটিতে সিনেট নির্বাচনে জয় পেল ডেমোক্র্যাটরা। ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে দলটির কোনো প্রার্থী সিনেটর নির্বাচিত হলেন।
নর্থ ক্যারোলাইনাতেও রিপাবলিকানদের আসন হাতছাড়া হয়েছে। সেখানে সাবেক গভর্নর ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রয় কুপার পরাজিত করেছেন রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলিকে। ফলে অঙ্গরাজ্যটির সিনেট আসনটিও ডেমোক্র্যাটদের দখলে এসেছে।
টেক্সাস ও কানসাসে ঐতিহাসিক জয়
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত ফল এসেছে টেক্সাসে। দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঙ্গরাজ্যটিতে দলটির প্রার্থী ও অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো। ধর্মতত্ত্বের শিক্ষার্থী টালারিকোর এই জয়কে ঐতিহাসিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, ১৯৯৪ সালের পর টেক্সাসে রাজ্যব্যাপী কোনো নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় ছিল না।
কানসাসেও প্রায় এক শতাব্দীর রিপাবলিকান আধিপত্যে বড় আঘাত এসেছে। সেখানে বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটন। একটি মেগাচার্চের যাজক হ্যামিলটনের জয়ে ১৯৩২ সালের পর প্রথমবারের মতো অঙ্গরাজ্যটি থেকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হলেন।
অন্যদিকে, ওহাইয়োতে রিপাবলিকান সিনেটর জন হাসটেডকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট শেরড ব্রাউন। এ ছাড়া আইওয়ায় রিপাবলিকান প্রার্থী অ্যাশলি হিনসনকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট জশ টুরেক।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাল রিপাবলিকানরা
নির্বাচনের আগে ১০০ সদস্যের সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ৫৩টি। ডেমোক্র্যাটদের ছিল ৪৫টি। বাকি দুটি আসনে থাকা স্বতন্ত্র সদস্যরা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতেন।
এবারের নির্বাচনে একাধিক আসনে জয় পাওয়ায় সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে ডেমোক্র্যাটরা। এর ফলে নতুন কংগ্রেসে আইন প্রণয়ন, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নিয়োগ অনুমোদন এবং প্রশাসনের কর্মকাণ্ড তদারকির ক্ষেত্রে দলটি বাড়তি ক্ষমতা পাবে।
সিনেটের বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্বও ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাবে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত, শুনানি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
ট্রাম্পের ‘ট্রাইফেক্টা’ নিয়ন্ত্রণের অবসান
২০২৪ সালের নির্বাচনে হোয়াইট হাউসের পাশাপাশি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছিল রিপাবলিকান পার্টি। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট, প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাকেন্দ্রই ছিল দলটির হাতে। মার্কিন রাজনীতিতে এই অবস্থাকে বলা হয় ‘ট্রাইফেক্টা’।
কিন্তু মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মধ্য দিয়ে সেই একক দলীয় কর্তৃত্বের অবসান ঘটেছে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণও এবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে সেখানে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে থাকলেও চূড়ান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয়নি।
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণও ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনকে কংগ্রেসে আরও বেশি বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুটি কক্ষের একটি সিনেট, অন্যটি প্রতিনিধি পরিষদ। সিনেটের সদস্যদের মেয়াদ ছয় বছর। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর।
সিনেটের সব আসনে একসঙ্গে নির্বাচন হয় না। প্রতি দুই বছর পরপর সাধারণত এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়। এবার নিয়মিত ৩৩টি আসনের পাশাপাশি দুটি বিশেষ নির্বাচনসহ মোট ৩৫টি আসনে ভোট হয়েছে।
ওহাইয়ো ও ফ্লোরিডার দুটি বিশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে আগের দুই সিনেটর ট্রাম্প প্রশাসনে যোগ দেওয়ায়। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রশাসনে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের আসন দুটি শূন্য হয়েছিল।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ যে দলের হাতে থাকে, তারা আইন প্রণয়নের পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভার সদস্য, ফেডারেল বিচারক ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা পালন করে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বাধা বাড়তে পারে। বিশেষ করে মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ, বিচারক নিয়োগ এবং প্রশাসনের বিভিন্ন মনোনয়ন অনুমোদনের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এ ছাড়া বিভিন্ন সিনেট কমিটির নেতৃত্ব পাওয়ায় প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত ও শুনানি আয়োজন করতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা। এমনকি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মুখেও দাঁড় করানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ বদলালেই প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা শেষ হয়ে যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখতে পারবেন। পাশাপাশি কোনো আইন পাস করতে দুই কক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতাও বহাল থাকবে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ নীতি বাস্তবায়নে দুই দলের মধ্যে সমঝোতার প্রয়োজন বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এনেছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রিপাবলিকানরা যেমন চাপে পড়েছে, তেমনি নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রতিনিধি পরিষদের চূড়ান্ত ফল এবং আগামী দুই বছর ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত সিনেটের সম্পর্কই নির্ধারণ করবে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক গতিপথ।
সূত্র: এপি নিউজ
এসি//