বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়া এক কিশোরী নির্যাতন কেলেঙ্কারি, ধন-সম্পদ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়ায় লুকিয়ে থাকা এক বিশাল জালকৌশল। জেফরি এপস্টেইন—একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, যিনি কিশোরী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন শোষণের অভিযোগে বছরের পর বছর তদন্ত ও বিতর্কের মুখে ছিলেন। তার রহস্যময় মৃত্যু, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ, এবং হঠাৎ প্রকাশিত ‘এপস্টেইন ফাইলস’—সবকিছুই বিশ্ববাসীর কৌতূহলকে উসকে দিয়েছে।
গত শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রায় ৩০ লাখেরও বেশি পৃষ্ঠার নথি, ১ লাখ ৮০ হাজারের মতো ছবি এবং ২ হাজার ভিডিও প্রকাশ করেছে। এই নথিপত্রে এপস্টেইনের মানি-লন্ডারিং, যৌন পাচার ও তার সৃষ্ট অন্ধকার জগতের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে।

প্রথমবার ২০০৮ সালে ফ্লোরিডার পাম বিচে এক কিশোরীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে তদন্তের মুখোমুখি হন এপস্টেইন। রাজনৈতিক ও আইনি প্রভাব খাটিয়ে বড় সাজা এড়াতে সক্ষম হলেও যৌন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হন। এরপর ২০১৯ সালে, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। কিন্তু বিচারের অপেক্ষায় কারাগারে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন, যা পরবর্তীতে আত্মহত্যা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
এই দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য ও এপস্টেইনের বিভিন্ন সম্পত্তিতে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নথিপত্র, ইমেইল, ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করা হয়। এই সমগ্র নথিপত্রকে ‘এপস্টেইন ফাইলস’ বলা হয়।
ফাইলসের মধ্যে রয়েছে এপস্টেইনের কারাগারে থাকা অবস্থায় মানসিক মূল্যায়ন, তার মৃত্যুর রহস্য, সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে তদন্ত ও দোষ স্বীকার, এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তার যোগাযোগের তথ্য। এ তথ্য প্রমাণ দেয় যে আইনি ঝামেলার মধ্যেও তিনি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।

ফাইলের আলোচিত অংশগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ‘ক্লায়েন্ট লিস্ট’ বা এপস্টেইনের কাছে যাদের নানান সুবিধা নেওয়ার তথ্য। তবে বিচার বিভাগ জানিয়েছে, এপস্টেইন ফাইলে কোনো সত্যিকারের ক্লায়েন্ট তালিকা ছিল না। অনেক কিছুই ইন্টারনেটে বিভ্রান্তিকরভাবে ছড়িয়েছে। জুলি কে ব্রাউন, দীর্ঘদিন এ মামলার অনুসন্ধানকারী সাংবাদিক, বলেছেন, এ তালিকা মূলত ভুল এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য, যা এপস্টেইনের বান্ধবী গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের ‘ব্ল্যাক বুক’ থেকে উদ্ভূত।
ফাইল প্রকাশের পরই অনেক হাইপ্রোফাইল ব্যক্তির নাম সামনে আসে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ব্রিটিশ রাজপরিবারের বিতাড়িত প্রিন্স অ্যান্ড্রু, পপ তারকা মাইকেল জ্যাকসন, জাদুকর ডেভিড কপারফিল্ড, বিনিয়োগকারী গ্লেন ডুবিন, নিউ মেক্সিকো প্রাক্তন গভর্নর বিল রিচার্ডসন, আইনজীবী অ্যালান ডারশোভিৎজ এবং চেইন হোটেল হায়াতের চেয়ারম্যান থমাস প্রিজকার এই তালিকায় রয়েছেন।
ফাইলের মধ্যে রয়েছে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমানের ফ্লাইট লগ বা ‘ব্ল্যাক বুক’, ছবি ও ভিডিও—যেখানে এপস্টেইন ও তার শিকারদের (কিছু নাবালক) ছবি ও ভিডিও রয়েছে, অবৈধ শিশু যৌন নির্যাতনের উপকরণ এবং ১০ হাজারের বেশি পর্নোগ্রাফিক ভিডিও। ফাইলগুলোতে ‘জন ডো’ বা পরিচয়হীন ব্যক্তিদের নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০২৪ সালের প্রথম দিকে এই তথ্য প্রকাশিত হয়।

ফাইলগুলোতে এপস্টেইনের অর্থ উপার্জন, যৌন পাচারের অর্থায়ন, তার মৃত্যুর রহস্য এবং গোয়েন্দা এজেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা—সব বিষয়েই আলোকপাত করতে পারে। যদিও কিছু তথ্য দাবিকৃত, তার প্রমাণ মেলেনি।
ফাইলসের প্রকাশ রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে এই নথি প্রকাশের চাপে ছিলেন। হাউস রিপাবলিকান পার্টি প্রকাশ আটকানোর চেষ্টা করলেও অবশেষে ৩০ জানুয়ারি প্রকাশ করা হয়। তবে বিচার বিভাগ জানিয়েছে, এক হাজারের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, যাদের মধ্যে নাবালকও রয়েছে, তাদের সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করলে আরও ট্রমা হতে পারে।
এপস্টেইন ফাইলস কেবল একটি যৌন অপরাধের কাহিনী নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার, নৈতিক অধঃপতন, আইনের অসাম্য এবং প্রভাবশালীদের অন্ধকার জগতের প্রতিচ্ছবি। ফাইল প্রকাশের পর কতজন প্রভাবশালীর নাম সামনে আসবে, এবং এর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব কী হবে, তা এখনো অপেক্ষার বিষয়।
সূত্র: বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান
এসি//