পারমাণবিক চুক্তিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা দ্রুতই বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে। এই টানটান পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য একটি বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে। এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রকে পেছন থেকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে চাপ দিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। তবে যুদ্ধের আশঙ্কা সামনে রেখে প্রস্তুতি কম রাখেনি ইরানও। বরং সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের ক্ষতি করার সক্ষমতা যে তেহরানের রয়েছে, তা উঠে এসেছে খোদ মার্কিন প্রভাবশালী গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে।
সোমবার (০২ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড ও ওয়াশিংটন পোস্টের পৃথক প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়।
টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনে জানানো হয়, রোববার (০১ ফেব্রুয়ারি) ইরান পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের এক নিরাপত্তা বৈঠক করেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দেশটির শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফেরা ইসরাইলি সেনাপ্রধান ইয়াল জামিরও ওই বৈঠকে অংশ নেন। ওয়াশিংটন সফরে তিনি ইরান ইস্যুতে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। একই সঙ্গে বৈঠকে মোসাদের প্রধান ডেভিড বার্নিয়াও উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছে ইসরাইলি গণমাধ্যম।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়, সফরটি গোপন রাখতে সামরিক বিমানের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বিমানে যুক্তরাষ্ট্রে যান ইয়াল জামির। ওয়াশিংটনে গিয়ে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
ইসরাইলি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ট্রাম্প প্রশাসনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, এই মুহূর্তে ইরানে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকলে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
এর আগে গত শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) পেন্টাগনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এবং ইসরাইলি সেনাপ্রধান ইয়াল জামির অংশ নেন। তবে বৈঠকের বিস্তারিত আলোচনা প্রকাশ করা হয়নি।
এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার ইরানকে হুমকি দেয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌবহর জোরদার করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এর উদ্দেশ্য তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। তবে ইরান সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা চালায়, তাহলে সেটি বড় আকারের আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
এমন প্রেক্ষাপটে ইয়াল জামিরের বরাত দিয়ে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, আগামী দুই সপ্তাহ থেকে দুই মাসের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে।
এদিকে যুদ্ধ শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানার জন্য ইরানের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়াশিংটন পোস্ট। মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তা মূল্যায়ন নথির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান এখনও কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্বার্থে আঘাত হানার ক্ষমতা রাখে। এসব সামরিক স্বার্থের মধ্যে রয়েছে ১০টিরও বেশি মার্কিন ঘাঁটি এবং সেখানে অবস্থানরত কয়েক দশ হাজার মার্কিন সেনা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের এক মিত্রের তৈরি করা মূল্যায়ন রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরান গোলাবারুদ, উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা বজায় রেখেছে। এসব সক্ষমতা এই অঞ্চলে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুর জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে।
ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, এই বাস্তবতা ট্রাম্প প্রশাসনের হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যদিও ট্রাম্প আগে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছিলেন, তবে এখন তিনি অবস্থান বদলে তেহরানকে পারমাণবিক আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন। যা ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে করা পরমাণু চুক্তি জেসিপিওএ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এক ইরানি কূটনীতিক বলেছেন, তেহরান সম্মানজনকভাবে সম্পৃক্ত হতে প্রস্তুত, তবে চাপ ও সামরিক হুমকির মধ্যে কোনো আলোচনায় বসবে না। এর আগে ১২ দিনের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র দখলদার ইসরাইলের পাশে অবস্থান নেয়। এর জবাবে ইরান কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান ইতোমধ্যেই এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের বুঝিয়ে দিয়েছে যে, পারস্য উপসাগরে প্রাণঘাতী হামলা চালানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে। নতুন কোনো সংঘাত শুরু হলে এসব হামলা সীমিত বা নিয়ন্ত্রিত থাকবে না বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
এরই মধ্যে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি আরব দেশ ঘোষণা দিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে নিজেদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে না।
এসি//