দেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত প্রায় ৪৫ লাখ নিরক্ষর মানুষকে জীবনমুখী শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতায় দক্ষ করে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুযোগ কাজে লাগানো, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং জনসংখ্যার কর্মক্ষম অংশকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে যুক্ত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মাধ্যমে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় সাধারণ অক্ষরজ্ঞান দেওয়ার পাশাপাশি নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে প্রায়োগিক সাক্ষরতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে।
অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অবশিষ্ট নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে কর্মমুখী শিক্ষার আওতায় এনে তাদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থান ও বাস্তব জীবনদক্ষতার সরাসরি সংযোগ তৈরি করাই এ উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য। শুধু পড়তে ও লিখতে শেখানোর মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৪৫ লাখ কর্মক্ষম মানুষকে প্রায়োগিক শিক্ষায় দক্ষ করে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, এ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে সাক্ষরতার হার ৯০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো জানায়, বয়স্ক ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষার আওতায় আনতে বৈশ্বিক ‘ইচ ওয়ান টিচ ওয়ান’ মডেল অনুসরণ করে ‘অ্যাডাল্ট অ্যান্ড ফাংশনাল লিটারেসি ফর অ্যাবিলিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম’ বা ‘আলফা’ গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রথম পর্যায়ে ৪০ জেলার ৪০টি উপজেলায় ৩৫ হাজার মানুষকে নিয়ে এক বছরের পাইলট কার্যক্রম শুরু হবে। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে দেশের ৪৫ লাখ নিরক্ষর মানুষকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা এবং ঝরে পড়া শিশু-কিশোরদের জন্যও একই কর্মসূচির আওতায় ১৫৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর প্রথম ধাপে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী ১৯ হাজার ২০০ শিশুকে উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী আরও ১৯ হাজার ২০০ ঝরে পড়া কিশোর-কিশোরীকে প্রাক-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক মনোয়ারা ইশরাত জানান, সরকারের লক্ষ্য শুধু পড়তে ও লিখতে শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষাবঞ্চিত মানুষকে কারিগরি ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জীবিকার সুযোগ তৈরি করাই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এর আগে কক্সবাজারে ‘স্কিলফো’ পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ৬ হাজার ৮২৫ তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে প্রকল্পটি একটি সফল মডেল হিসেবে তৈরি হয়েছে।
সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় আরও ১৬ জেলার ৬৪টি উপজেলায় ১ লাখ তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে ‘স্কিলফো’ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আজ ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের এই সমন্বিত উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করার পথ আরও সহজ হবে।
এসি//