বিনোদন

যে গান মান্না দে-কে ভেবে লেখা, অথচ গাইলেন হেমন্ত!

বিনোদন ডেস্ক

বাংলা পুজোর গানের ইতিহাসে সলিল চৌধুরী ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জুটি চিরকালই থাকবে প্রথম সারিতে। তাদের সৃষ্টির মধ্যে এমন কিছু গান আছে, যেগুলো শুধু একটি সময়ের জনপ্রিয় গান হয়ে থাকেনি—সময়ের সীমানা পেরিয়ে হয়ে উঠেছে চিরন্তন।

তেমনই এক গান ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’। কিন্তু কীভাবে তৈরি হয়েছিল এই কালজয়ী গান? এর পেছনের গল্পটিও কম চমকপ্রদ নয়।

সাল ১৯৬৯। নতুন পুজোর গান লেখার বরাত এসেছে সলিল চৌধুরীর কাছে। পুজোর সময় সলিল চৌধুরীর কথায় ও সুরে নতুন গান শোনার জন্য রীতিমতো অপেক্ষা করে থাকতেন শ্রোতারা। তিনিই গীতিকার, তিনিই সুরকার। তাই সলিল চৌধুরীর স্ত্রী সংগীতশিল্পী সবিতা চৌধুরী বলতেন, ‘সলিল সঙ্গীত’ বলা হোক সেই গানগুলিকে। কারণ সলিল একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার—সব কিছুই।

কথাটা একেবারেই ঠিক। বাংলা গানের জগতে বিস্ময়কর ও বৈপ্লবিক গীতিকার-সুরকার হিসেবে সলিল চৌধুরীর অবস্থান অনন্য। তার লেখা ও সুরে যেমন ছিল কবিতার সৌন্দর্য, তেমনি ছিল গল্প বলার শক্তি।

সলিলকে নিয়ে গুলজার বলেছিলেন, “সলিলদার লেখা বড়ই সিনেম্যাটিক। গল্প বলার একটা অসামান্য দক্ষতা ছিল ওর। কখনও তার প্রকাশ হতো কবিতার মাধ্যমে, কখনও বা সুরের মাধ্যমে।”

১৯৬৯ সালে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানির কলেজ স্ট্রিটের অফিসে বসে পুজোর গান লিখছিলেন সলিল। দুটো গান লেখা হয়ে গেল। সুরও তৈরি করে ফেললেন। এর মধ্যে একটি গানের সুর ছিল কিছুটা রক-ঘেঁষা।

গান দুটির সুর করার পর সলিল সেগুলো শোনালেন মেগাফোনের মালিক কমল ঘোষকে। তাদের মধ্যে ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। গান শুনে কমল ঘোষ জানতে চাইলেন, ‘কাকে দিয়ে গাওয়াবি গান দুটো?’

সলিল বললেন, “ভাবছি মান্নাকে (দে) দিয়ে এ বার পুজোয় গাওয়াব।”

কিন্তু কমল ঘোষের মনে হলো, গান দুটির জন্য অন্য একটি কণ্ঠই বেশি মানানসই। তিনি বললেন, “একেবারে ফুটবে না এ গান মান্নার গলায়। চল আমার সঙ্গে।”

কথা শেষ করেই সলিলকে সঙ্গে নিয়ে সোজা চলে গেলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে।

হেমন্ত-সলিল জুটির জয়যাত্রা তখনই বাংলা সংগীতের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। ১৯৪৯ সাল থেকে সলিল চৌধুরীর কথা ও সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের একের পর এক গান শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। তৈরি হয়েছে একের পর এক মাইলস্টোন।

তবে ১৯৬৯ সালের সেই পুজোয় সলিলের পরিকল্পনা ছিল অন্য রকম। তিনি মান্না দে-কে দিয়েই গান দুটি গাওয়ানোর কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু কমল ঘোষের সিদ্ধান্তে বদলে গেল সেই পরিকল্পনা।

সেদিন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বাড়িতেই ছিলেন। দরজা খুলতেই কমল ঘোষ বললেন, “হেমন্তদা, সলিল আপনার জন্য পুজোর গান নিয়ে এসেছে।”

পরিস্থিতিতে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলেন সলিল। কারণ গান দুটি তিনি হেমন্তকে ভেবে লেখেননি। মান্না দে-কে মাথায় রেখেই গান তৈরি করেছিলেন। এমনকি গান দুটির সংগীতায়োজনও সেভাবেই করা হয়েছিল।

তারপরও হেমন্তকে গান দুটি শোনালেন সলিল। আর আশ্চর্য ঘটনা ঘটল সেখানেই। মাত্র দুবার শুনেই গান দুটি গলায় তুলে নিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। এরপর বললেন, “রেকর্ডিংয়ের ডেটটা বলে দিও।”

বাড়ি থেকে বেরিয়ে কমল ঘোষকে সলিল প্রশ্ন করলেন, “এটা কেমন হল?”

কমলের উত্তর ছিল, “দ্যাখ, হেমন্তদা গাইলে তোর গান দুটো মারকাটারি হিট করবে।”

শেষ পর্যন্ত ঠিক সেটাই হয়েছিল।

গান দুটি ছিল ‘শোনো কোনও একদিন’ এবং ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’।

‘শোনো... কোনও একদিন, আকাশ বাতাস জুড়ে রিমঝিম বরষা’ গানটির সংগীতায়োজন ছিল রক ঘরানার। যা অনেকটাই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রচলিত গায়কী ও ইমেজের বাইরে। কিন্তু সেই গানেও নিজের কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য দিয়ে ছক ভেঙেছিলেন হেমন্ত।

আর ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’ হয়ে উঠল সলিল-হেমন্ত জুটির অন্যতম ঐতিহাসিক সৃষ্টি। গানটি আজও শ্রোতাদের কাছে সমানভাবে আবেগের।

গানের সেই পঙক্তিগুলো—

‘কারা যেন ভালবেসে আলো জ্বেলেছিল

সূর্যের আলো তাই নিভে গিয়েছিল।

নিজের ছায়ার পিছে ঘুরে ঘুরে মরি মিছে

একদিন চেয়ে দেখি আমি তুমিহারা।’

এই গানটির গল্প অবশ্য সেখানেই শেষ হয়নি। বাংলা পুজোর গান হিসেবে জনপ্রিয় হওয়ার পর সলিল চৌধুরী ‘নীল ধ্রুবতারা’র সুর ও ভাবনাকে আবার ব্যবহার করলেন হিন্দি সিনেমায়।

হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের ১৯৭১ সালের চলচ্চিত্র ‘আনন্দ’-এ সেই সুরেই তৈরি হলো ‘কহিঁ দূর জব দিন ঢল যায়ে’। রাজেশ খান্নার ঠোঁটে গানটি গাইলেন মুকেশ।

আর এখানেই গল্পে যোগ হলো আরেকটি অদ্ভুত অধ্যায়।

মান্না দে পরবর্তীকালে ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্তব্য করেছিলেন, “আনন্দ' ছবিতে ‘জিন্দেগি ক্যায়সি হ্যায় পহেলি' গানটা সলিলদা আমাকে দিয়ে গাওয়ালেন। খুব ইচ্ছে ছিল ‘কহিঁ দূর জব দিন ঢল যায়' গাইবার। কিন্তু সেই গানটা আমাকে বাদ দিয়ে মুকেশকে দিয়ে দিলেন।”

নিয়তির পরিহাস যেন এখানেই। যে গান দুটি সলিল চৌধুরী প্রথমে মান্না দে-কে ভেবেই তৈরি করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই গান বাংলা কিংবা হিন্দি—কোনো সংস্করণেই তাঁর কণ্ঠে শোনা গেল না।

একদিকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’, অন্যদিকে মুকেশের কণ্ঠে ‘কহিঁ দূর জব দিন ঢল যায়ে’—একই সৃষ্টির দুই ভাষার দুই কালজয়ী রূপ।

আর এই গল্প শুধু একটি গানের জন্মকথা নয়। এটি বাংলা সংগীতের দুই কিংবদন্তি সলিল চৌধুরী ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সৃষ্টিশীল বোঝাপড়ারও এক অনন্য স্মৃতি। একটি গান কার জন্য লেখা হয়েছিল, কে সেটি গাইলেন—তার চেয়েও বড় হয়ে রয়ে গেছে গানটির দীর্ঘস্থায়ী আবেদন।

সময়ের সঙ্গে পুজোর গান বদলেছে, শ্রোতার রুচি বদলেছে। কিন্তু ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’ আজও শুনলে মনে হয়—কিছু গান আসলে কোনো একটি সময়ের জন্য তৈরি হয় না। তারা থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতিতে।

 

এসি//