লাইফস্টাইল

এসি মেরামতের সময় বিস্ফোরণের ঝুঁকি বাড়ার কারণ

লাইফস্টাইল ডেস্ক

গরমের সময় ঘর ঠান্ডা রাখতে এসির ওপর নির্ভরতা বাড়ে। কিন্তু যন্ত্রটি নষ্ট হলে মেরামতের সময় কতটা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা অনেকেই জানেন না। বিশেষ করে এসির কম্প্রেসার ও রেফ্রিজারেন্ট সিস্টেমে থাকে উচ্চচাপ। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, তাপ ও দাহ্য গ্যাসের ঝুঁকি যুক্ত হলে সামান্য ত্রুটিও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

সম্প্রতি ঢাকার নয়াপল্টনে এসি মেরামতের সময় কম্প্রেসার বিস্ফোরণে ২৫ বছর বয়সী জীবন বর্মনের মৃত্যু সেই ঝুঁকির বিষয়টি আবার সামনে এনেছে। ৬ অক্টোবর সকালে একটি এসি মেরামতের সময় হঠাৎ কম্প্রেসার বিস্ফোরিত হলে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে বেলা পৌনে ১২টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। জীবন সেখানে কাজ শুরু করেছিলেন মাত্র কয়েক দিন আগে এবং ঘটনার সময় দোকানে একাই ছিলেন।

তবে নয়াপল্টনের ওই দুর্ঘটনা ঠিক কী কারণে ঘটেছে, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু সাধারণভাবে এসির কম্প্রেসার বা রেফ্রিজারেশন সিস্টেমে বিস্ফোরণ বা আগুনের মতো দুর্ঘটনার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে।

অতিরিক্ত চাপ ও তাপ

এসির কম্প্রেসার রেফ্রিজারেন্টকে চাপ দিয়ে সিস্টেমের মধ্যে ঘোরায়। কোনো কারণে সিস্টেমে চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে কম্প্রেসার ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। অতিরিক্ত তাপের সঙ্গে এই চাপ যুক্ত হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

সিস্টেমে বাতাস বা অন্য গ্যাস ঢুকে যাওয়া

এসি মেরামত বা রেফ্রিজারেন্ট ভরার সময় সিস্টেমের ভেতরে বাতাস বা অন্য অনাকাঙ্ক্ষিত গ্যাস ঢুকে গেলে চাপ ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে এ ধরনের সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

রেফ্রিজারেন্ট বেশি বা কম থাকা

এসিতে নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় বেশি রেফ্রিজারেন্ট ভরা হলে সিস্টেমে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। আবার রেফ্রিজারেন্ট কম থাকলেও কম্প্রেসারের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। তাই অনুমান করে গ্যাস ভরা বা বের করা নিরাপদ নয়।

বিদ্যুতের ত্রুটি

কম্প্রেসারের বৈদ্যুতিক সংযোগে ত্রুটি, শর্টসার্কিট, তারের সমস্যা বা অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার কারণে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। কম্প্রেসারের টার্মিনাল বা বৈদ্যুতিক অংশে ত্রুটি থাকলেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

রেফ্রিজারেন্ট লিক ও আগুনের উৎস

কিছু আধুনিক এসিতে এমন রেফ্রিজারেন্ট ব্যবহার করা হয়, যেগুলো দাহ্য। এসব গ্যাস লিক হয়ে আশপাশে জমে গেলে সেখানে বৈদ্যুতিক স্পার্ক, আগুন বা অতিরিক্ত তাপের উৎস থাকলে আগুন বা বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

কম্প্রেসারের যান্ত্রিক ত্রুটি

দীর্ঘদিনের ব্যবহারে কম্প্রেসার বা কনডেনসারের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার কনডেনসার নোংরা হয়ে গেলে তাপ ঠিকমতো বের হতে না পেরে সিস্টেমের ওপর চাপ বাড়তে পারে। সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ না করলে এই সমস্যাগুলো আরও গুরুতর হতে পারে।

মেরামতের সময় ভুল পদ্ধতি

এসি মেরামতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো সঠিক যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণ। চাপ পরীক্ষা না করে সিস্টেম খোলা, ভুলভাবে রেফ্রিজারেন্ট ব্যবহার করা, বৈদ্যুতিক সংযোগে কাজ করার সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন না করা কিংবা আগুনের উৎসের কাছে রেফ্রিজারেন্ট নিয়ে কাজ করা—এসব থেকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

দুর্ঘটনার আগে কি কোনো লক্ষণ দেখা যায়?

অনেক সময় এসি বড় ধরনের সমস্যার আগে কিছু সতর্ক সংকেত দেয়। যেমন—কম্প্রেসার থেকে অস্বাভাবিক শব্দ, অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া, পোড়া গন্ধ, বারবার সার্কিট ব্রেকার পড়ে যাওয়া, অস্বাভাবিকভাবে এসি বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা রেফ্রিজারেন্ট লিকের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

এসব লক্ষণ দেখা গেলে নিজে থেকে কম্প্রেসার খুলে দেখা বা গ্যাসের লাইনে কাজ করা ঠিক নয়। বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে প্রশিক্ষিত কারিগরের সাহায্য নেওয়াই নিরাপদ।

এসি দেখতে সাধারণ একটি ঘর ঠান্ডা করার যন্ত্র হলেও এর ভেতরে একই সঙ্গে রয়েছে বিদ্যুৎ, উচ্চচাপ, তাপ ও রাসায়নিক রেফ্রিজারেন্ট। তাই মেরামতের সময় সামান্য অসতর্কতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

নয়াপল্টনের জীবন বর্মনের মৃত্যুর সঠিক কারণ তদন্তে জানা যাবে। তবে এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়—এসি মেরামত শুধু একটি সাধারণ কারিগরি কাজ নয়; নিরাপত্তা মেনে না করলে এটি হয়ে উঠতে পারে জীবনঝুঁকির কাজ।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #এসি #বিস্ফোরণ