রাজধানীর পল্লবী থানার অন্তর্গত মিরপুর-১১ এলাকার ওয়াপদা বিহারী ক্যাম্পে একটি বাসা থেকে একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতদের মধ্যে দুই সন্তান ও তাদের মা-বাবা রয়েছেন। নিহতরা হলেন— মোহাম্মদ মাসুম (৩৫), তার স্ত্রী ফাতেমা আক্তার সুমি (৩০), তাদের ৪ বছর বয়সী ছেলে মিনহাজ ও ২ বছর বয়সী ছেলে আসাদ।
বৃহস্পতিবার (০৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম আলমগীর জাহান মরদেহগুলো উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, ঘটনাস্থলে পুলিশ ও সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট রয়েছে। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মরদেহগুলো হাসপাতাল মর্গে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। তবে মৃতদের নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিক জানা যায়নি।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম আলমগীর জাহান গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করি। ঘটনাস্থলে সিআইডির ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। আলামত সংগ্রহ ও সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে। এরপর মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হবে।
পুলিশ ও প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে এই ট্র্যাজেডির নেপথ্যে উঠে এসেছে চরম আর্থিক সংকটের এক কালো চিত্র।
স্থানীয়দের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, পরিবারটি গত কয়েক মাস ধরে ভয়াবহ ঋণের মধ্যে ডুবে ছিল। পাওনাদারদের চাপ এবং দিন দিন বাড়তে থাকা দেনা তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, দারিদ্র্য ও ঋণের চাপ সহ্য করতে না পেরে চরম হতাশা থেকেই পরিবারটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। তবে এটি সম্মিলিত আত্মহত্যা নাকি সন্তানদের বিষ প্রয়োগে হত্যার পর মা–বাবা নিজেরা প্রাণ দিয়েছেন—তা নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষা করছে পুলিশ।
ওয়াপদা বিহারী ক্যাম্পের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পরিবারটি এলাকাজুড়ে শান্ত ও নিরিবিলি হিসেবেই পরিচিত ছিল। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তাদের মধ্যে মানসিক বিষণ্নতার লক্ষণ লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। এক প্রতিবেশী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, পরিবারটি যে সংকটে ছিল তা তারা জানতেন, তবে এমন পরিণতির কথা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি।
এই ঘটনাটি সমাজের গভীর একটি সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো যখন ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়ে, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কার্যকর সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় সহায়তা কাঠামোর অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা মানুষের সামনে এমন চরম সিদ্ধান্তকে বাস্তব বিকল্প হিসেবে হাজির করছে।
একটি ছোট ঘর, অগণিত স্বপ্ন আর শেষে চারটি নিথর দেহ—মিরপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, অভাব আর হতাশা মানুষকে কতটা অসহায় করে তুলতে পারে। পরিবারটি কেন এমন পথ বেছে নিল, তার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নিবিড় তদন্তের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়েরের প্রস্তুতিও চলছে।
এসি//