আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বিপদ ডেকে এনেছেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মার্কিন–ইসরায়েল যৌথ বাহিনীর ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। এই অভিযানের মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। স্থল, নৌ ও বিমান অভিযানে ইরানের সামরিক অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

তবে এই সামরিক সাফল্য শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য কৌশলগত বিজয় বয়ে আনতে পারবে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দ্রুতই আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

জনস হপকিন্স স্কুল ফর অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের লরা ব্লুমেনফেল্ডের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান একটি জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তার মতে, এই যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, মার্কিন সামরিক নীতিতে সাধারণত দ্রুত ও সীমিত অভিযানকে অগ্রাধিকার দেয়া হলেও ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত “এপিক ফিউরি” অভিযান সেই অবস্থানের সঙ্গে কিছুটা ভিন্ন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের সামরিক হুমকি না থাকা সত্ত্বেও এই অভিযান শুরু করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে সংঘাত বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।

অভিযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক

বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন এই যুদ্ধের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা শেষ পরিণতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। শুরুতে যেখানে শুধু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের কথা বলা হচ্ছিল। পরে সেখানে ইরানি নৌবাহিনী ধ্বংস, আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীর ক্ষমতা শেষ করা এমনকি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ থেকে চিরতরে সরিয়ে রাখার কথাও বলা হচ্ছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি এই সমালোচনা নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই তার হিসেবে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস, তাদের নৌবাহিনী নিশ্চিহ্ন, প্রক্সি গোষ্ঠীকে অস্ত্র দেওয়ার ক্ষমতা শেষ করা ও তাদের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ চিরতরে বন্ধ করার লক্ষ্য তুলে ধরেছেন।

অভ্যন্তরীণ সমর্থন নিয়ে সংশয়

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং মার্কিন হতাহতের সংখ্যা বাড়লে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তার দল রিপাবলিকান পার্টির জন্যও রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (মাগা) আন্দোলনের সমর্থকরা এখনও ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন, যদিও তাদের মধ্যে কিছু অংশ সামরিক অভিযানের বিরোধী।

রিপাবলিকান পরিকল্পনাবিদ ব্রায়ান ডার্লিং বলেন, আমেরিকান জনগণ ইরাক ও আফগানিস্তানের ভুল পুনরাবৃত্তিতে আগ্রহী নয়। মাগা সমর্থকদের মধ্যে বিভক্তি দেখা যাচ্ছে— কেউ কেউ নতুন যুদ্ধ না চাইলেও ট্রাম্পের ওপর আস্থা রেখেছেন।

বিশ্লেষকদের উদ্বেগের আরেকটি কারণ ট্রাম্প ও তার সহযোগীদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। কোথাও তারা ইরানে শাসন পরিবর্তনের কথা বলছেন, আবার কোথাও সেটা এড়িয়ে যাচ্ছেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার (০৫ মার্চ)  ট্রাম্প রয়টার্সকে বলেছেন, তিনি ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনে ভূমিকা রাখবেন এবং ইরানি কুর্দি বিদ্রোহীদের উৎসাহ দিচ্ছেন। এরপরদিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করেছেন।

ইরানের পাল্টা পদক্ষেপে বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা

ইরান কিন্তু বসে নেই। তারা ইসরায়েল ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ পুনরায় ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে, যা যুদ্ধকে আরেকটি দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে। ইরান তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করে বিশৃঙ্খলা তৈরি এবং ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এ পর্যন্ত মার্কিন হতাহতের সংখ্যা কম— ছয়জন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। ট্রাম্প এ নিয়ে খুব একটা উদ্বেগ প্রকাশ না করে বরং আরও হতাহতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমার ধারণা, কিছু মানুষ মারা যাবে।

মধ্যপ্রাচ্যের সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন পানিকফ সতর্ক করে বলেন, মার্কিন হতাহতের ঘটনাই যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে। ইরান সেটাই প্রত্যাশা করছে।

ভেনেজুয়েলার সঙ্গে তুলনা করে কৌশলগত ভুলের আশঙ্কা

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে সামরিক অভিযানের প্রতি আরও আগ্রহী হয়েছেন। তারা মনে করছেন, ট্রাম্প ভেবেছিলেন ইরান অভিযানও ভেনেজুয়েলা অভিযানের মতোই সহজে শেষ হবে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে আসে মার্কিন বিশেষ বাহিনী। এরপর তেলসমৃদ্ধ দেশটিতে ট্রাম্পের অনুগতদের নিয়ে সরকার গঠন করা হয়, কোনো দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের প্রয়োজন পড়েনি।

কিন্তু ইরান অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুসজ্জিত প্রতিপক্ষ। খামেনি ও অন্যান্য শীর্ষ নেতা নিহত হলেও ইরান সামরিক ক্ষমতা দেখাচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমান শাসকরা ক্ষমতাচ্যুত হলে ইরান বিশৃঙ্খলায় পতিত হতে পারে এবং আরও কট্টরপন্থিরা ক্ষমতা দখল করতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে।

অর্থনৈতিক প্রভাব ও জ্বালানি সংকট

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি নিয়ে। বিশ্বের জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরানের হুমকির কারণে এখন সেখানে ট্যাংকার চলাচল বন্ধ থাকলে মারাত্মক অর্থনৈতিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের জোশ লিপস্কি বলেন, এটি মার্কিন অর্থনীতির জন্য বেদনাদায়ক একটি বিষয়, যা সম্ভবত পুরোপুরি আঁচ করা যায়নি।

ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানে হামলার আগে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ না করায় অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে সঠিক ধারণা নিতে পারেনি ট্রাম্পের দল।

দুই হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা ও প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ এক রিপাবলিকান সূত্র জানিয়েছে, শীর্ষ সহযোগীদের সতর্কতা উপেক্ষা করেই ট্রাম্প এই হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এক পশ্চিমা কূটনীতিকের ভাষায়, এটি একক ব্যক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিদর্শন।

সংকটে আরব মিত্রদের অবস্থান

উপসাগরীয় তেলসমৃদ্ধ আরব রাষ্ট্রগুলোর ওপরও ট্রাম্পের ভরসা অনেক। দীর্ঘদিন ধরে এরা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছে এবং ট্রাম্পকে বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার পর আরব মিত্ররা ট্রাম্পের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে। তবে সবাই ট্রাম্পের যুদ্ধের পক্ষে নয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধনকুবের খালাফ আল হাবতুর ট্রাম্পের কাছে প্রকাশিত খোলা চিঠিতে প্রশ্ন তুলেছেন, কে আপনাকে আমাদের অঞ্চলকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার অধিকার দিয়েছে?

যুদ্ধ কতদিন চলবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। প্রতিদিন ইরান অভিযানের খরচ বেড়েই চলেছে। ট্রাম্প বলেছেন, অভিযান চার-পাঁচ সপ্তাহ বা যতদিন প্রয়োজন চলবে, কিন্তু তার পর কী হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি।

ইরাক ও আফগানিস্তানে কাজ করা এবং সাবেক ইউরোপে মার্কিন সেনা কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল বেন হজেস মার্কিন সেনাবাহিনীর কৌশলের প্রশংসা করে বলেছেন, কিন্তু রাজনৈতিক, কৌশলগত ও কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হচ্ছে পুরো পরিকল্পনাটি আগে থেকে ভাবা হয়নি।

সূত্র: রয়টার্স

 

এসি//

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #মার্কিন #ইসরায়েল #ইরান #ডোনাল্ড ট্রাম্প