ভেনেজুয়েলায় সামরিক হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার পর থেকেই নিজের চরম আগ্রাসী রূপ জাহির করতে শুরু করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্য- এই দুই অঞ্চলকেই কেন্দ্র করে একের পর এক কড়া বার্তা দিচ্ছেন তিনি। মেক্সিকো, কলম্বিয়া ও কিউবার সরকার উৎখাতের ইঙ্গিতের পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে ভয়াবহ হামলার হুমকিও উঠে এসেছে তার বক্তব্যে।
তবে ট্রাম্পের কূটনৈতিক ও সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু লাতিন আমেরিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এবার তার নজর ইউরোপের দিকেও। ডেনমার্কের অধীনে থাকা গ্রিনল্যান্ড দখলের ইচ্ছা প্রকাশ করে নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি করেছেন তিনি। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ ও আয়তনে বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ—২১ লাখ ৬৬ হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত গ্রিনল্যান্ড—নিয়ে ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ডেনমার্কের প্রতি প্রচ্ছন্ন হুমকি হিসেবেই দেখছে বিশ্লেষকরা।
এই পরিস্থিতিতে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় একজোট হয়েছে ইউরোপের ছয়টি প্রভাবশালী দেশ। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন এবং যুক্তরাজ্য যৌথভাবে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কোনো ধরনের আগ্রাসী পদক্ষেপ ইউরোপ মেনে নেবে না।
মঙ্গলবার (০৬ জানুয়ারি) এসব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের একটি যৌথ বিবৃতিতে গ্রিনল্যান্ডের অধিকার রক্ষার কথা বলা হয়েছে।
ইউরোপীয় এ নেতারা গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত একটি যৌথ বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলেছেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডের অখণ্ডতা এবং সীমানার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ শুধু ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের জনগণের সিদ্ধান্তের বিষয়, বাইরের কোনো দেশের নয়।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ইউরোপের জন্য একটি মূল অগ্রাধিকার এবং অনেক ইউরোপীয় দেশ এই অঞ্চলকে নিরাপদ রাখার জন্য উপস্থিতি, কার্যক্রম ও বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। আর্কটিকে কিছু করতে হলে এটি ন্যাটো সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে, জাতিসংঘের সাংবিধানিক নীতিসমূহ মেনে করতে হবে যার মধ্যে রয়েছে সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডের অখণ্ডতা এবং সীমানার অবিনাশ্যতা। এগুলো সার্বজনীন নীতি এবং আমরা এগুলো রক্ষা করতে পিছপা হব না।
এতে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রচেষ্টায় একটি প্রয়োজনীয় অংশীদার হিসেবে রয়েছে। ন্যাটো সদস্য হিসেবে এবং ১৯৫১ সালে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে ডেনমার্ক-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রয়েছে, যা লঙ্ঘন করা অপরাধের সামিল হবে।
এছাড়া, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নরওয়ে এবং সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেছেন, নর্ডিক দেশ হিসেবে তারা আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
প্রসঙ্গত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিভিন্ন সময় গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং সামরিক উপায়ে তা অর্জনের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন। তবে, ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডরিকসেন ট্রাম্পকে হুমকি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
গত ৪ জানুয়ারি রাতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আরও একবার নিজের আগ্রাসী ইচ্ছার কথা জানান ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন… এটি এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিনল্যান্ডের সব জায়গায় চীনা আর রুশ জাহাজ দ্বারা পরিবেষ্টিত। জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন। আর ডেনমার্ক জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট এসময় জোর দিয়ে বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আমাদের কাছে গ্রিনল্যান্ডকে দিতে হবে এবং তারা এটি জানে।’
ট্রাম্পের এমন মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট্টে ফ্রেডরিকসন। তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে আমার সরাসরি বলতে হবে— তারা গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ করবে এ নিয়ে কথা বলার কোনো মানেই হয় না। ডেনমার্কের তিনটি অঞ্চলের কোনোটিই অধিগ্রহণ করার অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের নেই।’
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
এসি//